fbpx

রিয়াল মাদ্রিদঃ কোপা ডেল রে

champion-of-copa-del-rey-2011

স্প্যানিশ ও বিশ্ব ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ।ইউরোপিয়ান ও বৈশ্বিক বিভিন্ন শিরোপা যেমন ক্লাবের শোকেসে রয়েছে, তেমনি অর্জনের পাল্লায় রয়েছে অনেক ঘরোয়া শিরোপাও। তেমনই একটি শিরোপা হলো কোপা ডেল রে। এটি একটি স্প্যানিশ কাপ প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রথম বিভাগ থেকে শুরু করে স্পেনের সব বিভাগের ক্লাবই অংশগ্রহণ করে থাকে।

অবাক করার মত ব্যাপার হলেও এটি সত্যি যে, এটিই স্প্যানিশ ক্লাব ফুটবলের প্রাচীণতম টুর্ণামেন্ট, যা এখনো চলছে। এমনকি এই টুর্ণামেন্টের সূচনালগ্নে লা লিগাও আলোর মুখ দেখেনি স্পেনে। লা লিগা যেখানে ১৯২৯ সালে শুরু হয়েছিল, সেখানে কোপা ডেল রে আয়োজিত হয়ে আসছিল তারও ২৬ বছর আগে থেকে অর্থাৎ ১৯০৩ সালে। লা লিগা শুরু হবার পূর্বে এই টুর্ণামেন্টের চ্যাম্পিয়নকেই স্পেনের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বলা হতো। মাঝে কোপা ডে লিগা, কোপা এভা দুয়ার্তে সহ অনেক ঘরোয়া টুর্ণামেন্ট আয়োজিত হলেও আজ অব্দি শুধু এই কোপা ডেল রে টুর্ণামেন্টই টিকে আছে, বাকি সবই হারিয়ে গেছে কালের অতল গহবরে।

কোপা ডেল রে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯০৩ সালে। তবে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে এই টুর্ণামেন্ট আয়োজিত হয়েছিলো আরো এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯০২ সালে।

সালটি পরিচিত লাগছে? হ্যা, যেই বছর রিয়াল মাদ্রিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সে বছরেই স্প্যানিশ ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে পুরনো এই টুর্ণামেন্টটি প্রথমবার আয়োজিত হয়েছিল। তখন অবশ্য রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবের পরিচিতি ছিল মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাব নামে। টুর্ণামেন্টটির নামও তখন কোপা ডেল রে ছিল না, ছিল কোপা ডে লা করোনেসন। মূলত স্প্যানিশ রাজা কিং ত্রয়োদশ আলফোন্সোর রাজ্যাভিষেক উদযাপনের জন্যে এই টুর্নামেন্টটি আয়োজনের পরিকল্পনা হয়। ৬ দলের অংশগ্রহণে সেবার আয়োজিত হয় টুর্নামেন্টটি। তবে রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন এটিকে আফিশিয়ালি স্বীকৃতি না দিলেও এটি যে টুর্ণামেন্টটির ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছিল তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

এই টুর্ণামেন্টটি আরো একটি কারণে আলাদা। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামায় যেখানে অন্য সব বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থমকে গিয়েছিল সেখানে এই টুর্ণামেন্টটি চলমান ছিল তার আপন গতিতে। কেবলমাত্র স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের জন্যে ১৯৩৬ আর ১৯৩৭ সালে কোপা ডেল রে অনুষ্ঠিত হয়নি।

যেকোন ক্লাব প্রতিযোগিতায়ই রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্য যেন অবিশ্যম্ভাবী বিষয়। সেখানে ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় তো অল হোয়াইটরা সাফল্য পাবেই। এই টুর্ণামেন্টটির ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। এখন পর্যন্ত ১৯ বার কোপা ডেল রে শিরোপা ঘরে তুলতে পেরেছে, যা টুর্ণামেন্টের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। ২৩টি শিরোপা নিয়ে অ্যাথলেটিক বিলবাও আর ৩০টি শিরোপা নিয়ে বার্সেলোনাই কেবল তাদের ওপরে আছে।

যদিও ১৯০৩ সালে কোপা ডেল রে ইতিহাসের প্রথম ফাইনালে টুর্ণামেন্টের দ্বিতীয় সফলতম দল অ্যাথলেটিক বিলবাও এর কাছে রিয়াল পরাজিত হয়েছিল, তবে রিয়াল মাদ্রিদের প্রথম অফিশিয়াল শিরোপাও ছিল এই কোপা ডেল রে ট্রফিই। ১৯০৫ সালে সেই অ্যাথলেটিক বিলবাওকে ১-০ গোলে হারিয়ে এই শিরোপা জিতে নেয়  অল হোয়াইটসরা। পরবর্তীতে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত টানা ৪ বার এই শিরোপা ঘরে তুলে রিয়াল মাদ্রিদ। যার বদৌলতে ১৯০৯ সালে রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের অন্যতম ফাউন্ডিং সাইড হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে রিয়াল। তবে ১৯০৮ সালে নিজেদের ৪র্থ শিরোপা জেতার পর পরের শিরোপা জিততে রিয়ালকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৯ বছর। ১৯১৭ সালে অ্যারেনাসকে ২-১ গোলে হারিয়ে ৫ম বারের মত এই ট্রফি জিতে নেয় তারা। তখন অবশ্য ক্লাবের নাম ছিল মাদ্রিদ এফসি। এই নামে সেটিই ছিল ক্লাবের শেষ শিরোপা। কারণ ১৯২০ সালে স্প্যানিশ রাজা কিং ত্রয়োদশ আলফোনসো ক্লাবের নাম মাদ্রিদ এফসির সাথে “রিয়াল” জুড়ে দেন।

নতুন নাম রিয়াল মাদ্রিদ নিয়ে এই টুর্ণামেন্টে প্রথম সাফল্য পেতে অবশ্য রিয়ালকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল অনেক দিনই। ১৯২৪, ১৯২৯, ১৯৩০ আর ১৯৩৩ সালে ৪ বার ফাইনালে গিয়েও শেষ হাসি হাসা হয়নি তাদের। অবশেষে ক্লাবের নামে রাজকীয়তার প্রতীক পাবার পরে রিয়াল এই টুর্ণামেন্টের প্রথম শিরোপা জেতে ১৯৩৪ সালে, ভ্যালেন্সিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে। ২ বছর পর ১৯৩৬ সালে আবারও এই শিরোপা জয় করে তারা । এবার তারা ফাইনালে ২-১ গোলে হারায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে। এই শিরোপাটা একটু আলাদা আরেকটি কারণে। এই আসরের চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় এবারের ট্রফিটি রিয়াল মাদ্রিদকে চিরতরে দিয়ে দেয়া হয়। কারণ এটিই ছিল “কোপা ডে লা রিপাবলিকা” নামে আয়োজিত স্প্যানিশ কাপের সর্বশেষ আসর।

মাঝে আবার প্রায় এক দশক এই টুর্ণামেন্টের শিরোপার স্বাদ পায়নি অল হোয়াইটসরা। এই সময়ে ১৯৪০ আর ১৯৪৩ সালে দুবার ফাইনালে গেলেও রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় তাদের। তবে ১৯৪৩ সালে ফাইনালে যাবার পথে রিয়াল এমন এক কীর্তি গড়ে গিয়েছিল যা আজও সর্বমহলে চর্চিত। সেবার সেমি ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ ছিল আর্ক রাইভাল বার্সেলোনা। প্রথম লেগে বার্সেলোনার মাঠে ০-৩ গোলে হেরে আসে রিয়াল। তবে ফিরতি লেগে ঘরের মাঠে কাতালানদের ১১-১ গোলে বিধ্বস্ত করে অল হোয়াইটরা। কোপা ডেল রে এর ইতিহাসে তো বটেই, এল ক্লাসিকোর ইতিহাসেও সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড এটি। যদিও এই ম্যাচটিকে ঘিরে অনেক বিতর্কের কথা শোনা যায় আজও। তবুও রেকর্ডবুকে এই ম্যাচ এবং এই ম্যাচের স্কোরলাইন দুটির জায়গাই অনন্য।

আরেকটি কথা তো বলা হলো না । স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারের পর ১৯৩৯ সাল থেকে এই টুর্ণামেন্টের নাম হয় “কোপা ডে লা জেনারেলিসিমো”। নতুন ট্রফির নতুন টুর্ণামেন্টের নতুন নামকরণের পর ভ্যালেন্সিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ১৯৩৬ সালের পর রিয়াল মাদ্রিদ প্রথমবার এই ট্রফি জিতে নেয় ১৯৪৬ সালে। পরের বছরেই অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে গোলশূন্য থাকা নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়ের দুই গোলে এস্পানিয়লকে ২-০ গোলে হারিয়ে আবারও এই ট্রফি ঘরে তুলে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু ৯ম স্প্যানিশ কাপ জেতার পর ১০ম শিরোপা জিততে রিয়ালকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ১৫ বছর। যার মধ্যে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সালের ৪ বছরের মধ্যে ৩ বারই ফাইনালে গিয়েও পরাজিত হতে হয় অল হোয়াইটরা, যার প্রতিটিই ছিল নিজেদের ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। অবশেষে ১৯৬২ সালে সেই বার্নাব্যুতেই নিজেদের দর্শকদের সামনে সেভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে এই গেরো ভাঙ্গে রিয়াল।

এরপর নিজেদের মাঠে আরো কয়েকবার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হলেও রিয়াল আর ফাইনালে যেতে পারছিলো না। অবশেষে নিজেদের দর্শকদের সামনে আবারও শিরোপা জেতার সুযোগ এলো ১৯৬৮ সালে। কিন্তু রিয়াল তো শিরোপা জিততে পারলোই না, উল্টো আর্ক রাইভাল বার্সেলোনার কাছে ০-১ গোলে হেরে গেলো নিজেদের ডেরায়ই। এর প্রতিশোধ অবশ্য রিয়াল নিয়েছিল দুই বছর পরেই। না, বার্সেলোনাকে হারিয়ে না, বরং ভ্যালেন্সিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বার্সেলোনার হোমগ্রাউন্ড ন্যু ক্যাম্পে ১৯৭০ সালের ডমেস্টিক কাপ উদযাপন করেছিল অল হোয়াইটরা। রিয়াল মাদ্রিদ এরপর ১৯৭৪ আর ১৯৭৫ সালে টানা দুবার এই শিরোপা জিতে নেয়, প্রথমবার বার্সেলোনাকে ৪-০ গোলে এবং পরেরটি নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে তাদেরই মাঠে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে। “কোপা ডেল জেনারেলিসিমো” নামে এটিই ছিল রিয়ালের সর্বশেষ শিরোপা।

পরের বছর চ্যাম্পিয়ন হয়ে এই ট্রফি একেবারে নিজেদের করে নেয় অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। এরপর থেকে এই টুর্ণামেন্টের নাম হয় কোপা ডেল রে। আজও স্প্যানিশ ডমেস্টিক কাপ পরিচিত এই নামেই। নতুন নাম হবার পর ১৯৭৯ সালে প্রথমবার ফাইনালে পৌছালেও ভ্যালেন্সিয়ার কাছে সেবার ০-২ গোলে হেরে যায় তারা। তবে পরেরবার ঠিকই চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ হাসি হেসেছিল রিয়াল মাদ্রিদ, সেটাও আলাদাভাবে। কারণ ফাইনাল হেরেও রানারআপ দল ছিল চ্যাম্পিয়ন দলের মতই খুশি, সেটাও ১-৬ গোলের ব্যাবধানে হেরে। অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন এও কিভাবে সম্ভব? হ্যা, এমনটাই ঘটেছিল সেবার। কারণ সেবার ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ ছিল কাস্তিয়া, যা কি না রিয়াল মাদ্রিদেরই ইমিডিয়েট জুনিয়র অর্থাৎ দ্বিতীয় দল/বি দল। কোপা ডেল রে ইতিহাসে একই ক্লাবের দুই দল ফাইনালে যাবার নজির এই একটিই এবং ব্যাতিক্রমী এই রেকর্ডের অধিকারী রিয়াল মাদ্রিদ।

১৯৮২ আর ১৯৮৩ সালে ফাইনালে গেলেও টানা দুবার শিরোপার স্বাদ আর পাওয়া হয়নি রিয়ালের। কারণ ১৯৮২ সালে স্পোর্টিং গিজনকে ২-১ গোলে হারালেও পরের বছর বার্সেলোনার কাছে একই ব্যবধানে হেরে যায় তারা। ১৯৮৯ আর ১৯৯০ সালে রিয়াল মাদ্রিদ টানা আবারও টানা দুবার কোপা ডেল রে এর ফাইনালে পৌঁছালেও এবারেও ব্যাক টু ব্যাক ঘরোয়া কাপ কিততে ব্যর্থ হয় তারা। কারণ ১৯৮৯ সালে রিয়াল জারাগোজাকে ফাইনালে ১-০ গোলে হারালেও পরের বছর ফাইনালে বার্সার কাছে ০-২ গোলে পরাজিত হয় রিয়াল। ১৯৮৯ সালের কোপা ডেল রে জয়টা আলাদা একটা কারণে, সেটি হলো এই বছরেই রিয়াল মাদ্রিদ সর্বশেষ “ডমেস্টিক ডাবল” (ডমেস্টিক লিগ এবং ডমেস্টিক কাপ) জিতে নেয়।

১৯৯২ সালে রিয়াল মাদ্রিদ আবারও ফাইনালে গেলেও ঘরের মাঠে সিটি রাইভাল অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে ০-২ গোলে পরাজিত হয়। তবে পরের বছরেই ১৯৯৩ সালে রিয়াল জারাগোজাকে ২-০ গোলে হারিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ তাদের ১৭তম কোপা ডেল রে টাইটেল জিতে নেয়। তখনো ডমেস্টিক কাপ সংখ্যায় সমসাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে রিয়ালের ব্যাবধান কমই ছিল। কিন্তু এরপর এই প্রতিযোগিতায় রিয়াল মাদ্রিদ কেমন যেন অপাংক্তেয় হয়ে গেল। এমন না যে রিয়ালের স্কোয়াড গড়পড়তা ছিল। ঘরোয়া লিগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অল হোয়াইটরা যেমন বিধ্বংসী ছিল, ঘরোয়া কাপে যেন তারা ততটাই অচেনা এক দল। পরবর্তী ১৮ বছর বা দেড় যুগে রিয়াল যেন এই ট্রফির স্বাদই ভুলে গিয়েছিল। ২০০২ সালে ক্লাবের শততম জন্মদিনে এই টুর্ণামেন্টের ফাইনালে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে নিজেদের দর্শকদের সামনে দেপোর্তিভো লা করুনার কাছে ১-২ গোলে হেরে গিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ। ক্লাবের ইতিহাসে যা “সেন্টেনারিয়াজো” ট্র্যাজেডি হিসেবে পরিচিত। ২০০৪ সালে পুরো সিজন খুব ভালো অবস্থানে কাটানোর পরেও ফাইনালে গিয়ে রিয়াল জারাগোজার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময় শেষে ২-৩ গোলে হারতে হয় অল হোয়াইটদের।

অবশেষে দেড় যুগের ঘরোয়া কাপের হাহাকারের অবসান হলো ২০১১ সালে এসে। এই শিরোপার একটি বিশেষত্ব আছে। ২০১০ সালের কোপা ডেল অরে চ্যাম্পিয়ন ছিল সেভিয়া। ২০১০ সালে স্পেন প্রথমবারের মত ফিফা বিশ্বকাপ জিতে নেয়। তো ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সেভিয়া আবেদন করে স্পেনের জেতা বিশ্বকাপের সম্মানে যেন আগের বছরের কাপ ট্রফিটি তাদের চিরতরে দিয়ে দেয়া হয়। রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনও তাদের দাবি মেনে নেয় এবং পরবর্তীতে এই টুর্ণামেন্টের জন্যে একটি নতুন ট্রফি তৈরী করা হয়। বর্তমানে কোপা ডেল রে চ্যাম্পিয়নকে এই ট্রফিই প্রদান করা হয়। আর নতুন এই ট্রফির স্বাদ প্রথম নেয় রিয়াল মাদ্রিদ। অতিরিক্ত সময় শেষে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের ১৮তম কোপা ডেল রে শিরোপা জিতে নেয় সর্বসাদার সেনানীরা।

তবে নতুন নকশার ঐ ট্রফিটি রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফিকেস পর্যন্ত যেতে পারেনি। মাদ্রিদের সিবেলেস স্কয়ারে ট্রফি নিয়ে উদযাপনের সময়ে ছাদখোলা দোতালা বাসে রিয়াল মাদ্রিদের বর্তমান অধিনায়ক সার্জিও রামোসের হাত থেকে দুর্ঘটনাবশত ট্রফিটি পড়ে ভেঙ্গে যায়। পরে সেই ভেঙ্গে যাওয়া ট্রফির ১০ টুকরো উদ্ধার করা হয়। তারপর রিয়াল মাদ্রিদকে সেই ট্রফির একটি রেপ্লিকা প্রদান করা হয় এবং সেটিই ক্লাবের ট্রফিকেসে রাখা হয়।

sergio-ramos-drops-copa-del-rey-busbroken-copa-del-rey-trophy

 

২০১৩ সালে আবারও এই প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠে রিয়াল মাদ্রিদ, ফাইনালের ভেন্যুও ছিল নিজেদের হোমগ্রাউন্ড সান্তিয়াগো বার্নাব্যুই। কিন্তু অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে প্রথমে এগিয়ে গিয়েও ১৪ বছরের মধ্যে প্রথমবার মাদ্রিদ ডার্বিতে পরাজয়ের মাশুল গুনে অতিরিক্ত সময় শেষে ১-২ গোলে হার মানতে হয় রিয়ালকে। পরের বছরেই অবশ্য আবারও ফাইনালে উঠে রিয়াল মাদ্রিদ। এবার আর কোন ভুল করেনি তারা। ফাইনালে আর্ক রাইভাল বার্সেলোনাকে ২-১ গোলে পরাজিত করে ১৯তমবারের মত চ্যাম্পিয়ন হয় অল হোয়াইটরা। এখন পর্যন্ত এটিই রিয়াল মাদ্রিদের সর্বশেষ কোপা ডেল রে ট্রফি শিরোপা জয়।

এবার আসি এই টুর্ণামেন্টে রিয়াল মাদ্রিদের বিভিন্ন খেলোয়াড়দের ব্যাক্তিগত যত অর্জনের দিকে। এই টুর্ণামেন্টে এখন পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কার্লোস সান্তিলানা। এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড এই প্রতিযোগতায় রিয়ালের হয়ে খেলেছেন ৮৪ ম্যাচ। এই টুর্ণামেন্টে এখন পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন যৌথভাবে ফেরেঙ্ক পুসকাস ও কার্লোস সান্তিলানা। দুজনেই এই প্রতিযোগিতায় রিয়ালের হয়ে করেছেন ৪৯ গোল। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এক মৌসুমে কোপা ডেল রে তে সবচেইয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড ফেরেঙ্ক পুসকাসের। “গ্যালোপিং মেজর” খ্যাত এই হাঙ্গেরিয়ান ফরোয়ার্ড অল হোয়াইটদের হয়ে ১৯৬০-৬১ সিজনে করেছিলেন ১৫ গোল। একটি কোপা ডেল রে ম্যাচে রিয়ালের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডেও আছে পুসকাসের নাম। তবে এই রেকর্ডটি তাকে ভাগাভাগি করতে হচ্ছে বেনগুরিয়ার সাথে। কারণ দুজনেই একবার করে একটি কোপা ডেল রে ম্যাচে করেছিলেন ৬ গোল। খেলোয়াড় হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সবচেয়ে বেশি কোপা ডেল রে জিতেছেন যৌথভাবে হোসে আন্তোনিও কামাচো, জর্জিও বেনিতো রুবিও এবং মিগুয়েল এঞ্জেল। এই  তিনজন স্প্যানিশই রিয়ালের হয়ে ৫ বার এই প্রতিযোগিতা জিতেছেন। এই প্রতিযোগিতায় রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করেছিলেন ক্লাবের কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ও অধিনায়ক ফার্নান্দো হিয়েরো (৩৪ বছর ৯ মাস ২২ দিন, ২০০৩ সালের ১৪ জানুয়ারি)। এই প্রতিযোগিতায় রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে গোল করেছিলেন ক্লাবের কিংবদন্তি অধিনায়ক ও একসময়ের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার রাউল গঞ্জালেস ব্লাংকো (১৭ বছর ৭ মাস ১৩ দিন, ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫, ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে)। রিয়াল মাদ্রিদের ম্যানেজারদের মধ্যে এই টুর্ণামেন্টে সবচেয়ে সফল ক্লাবের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ট্রফি জেতা ম্যানেজার মিগুয়েল মুনোজ। এই স্প্যানিশ কোচের অধীনে ৩ বার এই শিরোপা ঘরে তুলেছে অল হোয়াইটরা।

ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক যেকোন প্রতিযোগিতায় রিয়াল মাদ্রিদের সাফল্য সবসময়েই উজ্জ্বল। এখন অব্দি অফিশিয়ালি রিয়াল মাদ্রিদ জিতেছে ৯২টি ট্রফি। যার মধ্যে ৬৬টি ঘরোয়া শিরোপা এবং ২৬টি ইউরোপীয়/মহাদেশীয় এবং আন্তর্জাতিক শিরোপা। ৬৬টি ঘরোয়া শিরোপার মধ্যে ৩৪টি শিরোপাই এসেছে লিগ শিরোপা থেকে। তুলনামুলকভাবে কাপ প্রতিযোগিতায় কিছুটা অনুজ্জ্বলই বলা চলে রিয়াল মাদ্রিদকে। ১৯টি শিরোপা জিতেছে ঠিকই, কিন্তু ফাইনাল হেরেছে তার চেয়েও বেশি (২০)। কখনো আনকোরা দলের কাছে পরাজিত হতে হয়েছে আবার কখনো টুর্ণামেন্টের মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। এই যেমন ২০১৪-১৫ সিজনে নিষেধাজ্ঞায় থাকা খেলোয়াড় খেলানোর দায়ে টুর্ণামেন্ট থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল রিয়ালকে। রিয়াল মাদ্রিদের মত একটি ওয়েল ম্যানেজড ক্লাবের সাথে যা চরম বেমানান। রিয়াল মাদ্রিদ যদি ডমেস্টিক কাপে আরেকটু মনযোগী হতো, তাহলে হয়ত ঘরোয়া সাফল্যে আরো এগিয়ে থাকতো তারা, হয়ত এতদিনে অফিশিয়াল ট্রফির সেঞ্চুরিও করে ফেলতে পারতো তারা। কে বলতে পারে, হয়ত এই কোপা ডেল রে জয়ের মাধ্যমেই শততম অফিশিয়াল ট্রফি জেতার মাইলফলক গড়বে রিয়াল মাদ্রিদ।