fbpx

লা উনডেসিমা – গৌরবময় ইতিহাসের ইতিবৃত্ত

history-of-la-undecima

ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে মর্যাদার আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ । সর্বোচ্চ মর্যাদার এই আসরে সবচেয়ে বেশি ১৩ বার শিরোপা জিতেছে স্প্যানিশ ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। টানা সবচেয়ে বেশি ৫ বার শিরোপাজয়ী একমাত্র ক্লাবও এই রিয়াল মাদ্রিদ। গত ২০১৫-১৬ মৌসুমে আমরা জিতে নিয়েছি একাদশতম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, যা স্প্যানিশ ভাষায় পরিচিত “লা উনডেসিমা” নামে । কিন্তু এই অর্জনের জন্যে রিয়াল মাদ্রিদকে পার করতে হয়েছে বেশ কিছু কঠিন ধাপ আর সময়। আসুন দেখে নিই সেসবের ইতিহাস –

★ লা ডেসিমা তথা দশম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জয়

২০১৪ সালের ২৪ মে, লিসবনের এস্তাদিও দি ল্যুজে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে ৪-১ গোলে হারিয়ে এক যুগ পর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের স্বাদ পায় রিয়াল মাদ্রিদ। ৩৬ মিনিটে ডিয়েগো গডিনের গোলে পিছিয়ে গেলেও সার্জিও রামোসের “৯২:৪৮” এ সমতায় ফেরে রিয়াল। অতিরিক্ত সময়ে গ্যারেথ বেল, মার্সেলো ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর গোলে রোজি ব্লাঙ্কোদের হারিয়ে “লা ডেসিমা” জিতে রিয়াল মাদ্রিদ।

★ ট্রান্সফার উইন্ডোতে রিয়াল প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের হঠকারী সিদ্ধান্ত

২০১৩-১৪ মৌসুমের পর অনুষ্ঠিত হয় ফিফা বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের কারণে প্রেসিডেন্ট পেরেজ দলে টানেন টনি ক্রুস ও হামেস রদ্রিগেজকে। কিন্তু এরই মাঝে করে বসলেন একটি বড় ভুল। দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেতনের দাবি করায় বিক্রি করে দিলেন আগের মৌসুমের দলের অন্যতম সেরা পারফরমার অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়াকে। দল থেকে চলে গেলেন জাবি আলোনসো, ডিয়েগো লোপেজসহ বেশ কিছু খেলোয়াড় ; লোনে গেলেন ক্যাসিমেরো, আলভারো মোরাতারা। এক কথায় ভেঙ্গে গেল লা ডেসিমা জয়ী দলটাই।

★ উইনিং কম্বিনেশন ভাঙার পরিণাম

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী দলের কম্বিনেশন ভাঙার মাশুল রিয়াল মাদ্রিদ চরমভাবে দিল পরের মৌসুমে। মৌসুমের শুরুতে টানা ২২ ম্যাচ জিতেও মৌসুম শেষ করতে হয়েছে কোন মেজর ট্রফি ছাড়াই। লা লিগায় দীর্ঘদিন শীর্ষে থেকেও শেষদিকে খেই হারিয়ে লিগ বিসর্জন দিতে হয়েছে। কোপা ডেল রে তে বাদ পড়তে হয়েছে শেষ ষোলোতেই।

ডিফেন্ডিং ইউসিএল চ্যাম্পিয়ন হিসেবে গ্রুপ পর্বের সবকয়টি ম্যাচ জিতে পূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে শুভসূচনা করলেও নকআউট পর্বে নিদারুণ ভুগতে হয় রিয়ালকে। শেষ ষোলোতে শালকেকে তাদের মাঠে ২-০ গোলে হারালেও নিজেদের মাঠে রিয়াল হেরে যায় ৩-৪ গোলে। তবে অ্যাগ্রিগেটে ৫-৪ গোলের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে যায় তারা। কোয়ার্টার ফাইনালে আগেরবারের ফাইনালের প্রতিপক্ষ অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে তাদের মাঠে প্রথম লেগে গোলশূন্য ড্র করে রিয়াল। তবে সাসপেনশন আর ইনজুরি জর্জরিত রিয়াল মাদ্রিদ দ্বিতীয় লেগে শেষ মুহূর্তের গোলে অ্যাটলেটিকোকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে চলে যায়। তবে সেমিফাইনালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে আর পেরে উঠেনি তারা। প্রথম লেগে তাদের মাঠে ১-২ গোলের পরাজয় আর দ্বিতীয় লেগে ১-১ গোলের ড্রয়ে অ্যাগ্রিগেটে ২-৩ গোলে হেরে বিদায় নেয় রিয়াল মাদ্রিদ।

★ ২০১৫-১৬ মৌসুম – একটি নতুন শুরু

২০১৪-১৫ মৌসুমে ব্যর্থতার স্বরূপ বরখাস্ত করা হল রিয়ালের লা ডেসিমা জয়ের নেপথ্য কারিগর কার্লো অ্যানচেলত্তিকে, দায়িত্বে এলেন রাফায়েল বেনিতেজ। তার অধীনে লিগে রিয়াল চলছিল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, নিষেধাজ্ঞায় থাকা খেলোয়াড় খেলিয়ে বাদ পড়লো কোপা ডেল রে থেকে। একমাত্র চ্যাম্পিয়ন্স লিগেই যা একটু সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল রিয়াল।

২০১৫-১৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ যাত্রার সূচনা হয়েছিল গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে নিজেদের মাঠে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর হ্যাটট্রিক ও করিম বেনজেমার গোলে শাখতার দোনেতস্ককে ৪-০ গোলে হারিয়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে রোনালদোর জোড়া গোলে অ্যাওয়ে ম্যাচে মালমোকে ২-০ গোলে পরাজিত করে রিয়াল মাদ্রিদ। পরের ম্যাচে প্যারিসে গিয়ে ফ্রেঞ্চ চ্যাম্পিয়ন পিএসজির সাথে গোলশূন্য ড্র করে রিয়াল মাদ্রিদ। তবে পরবর্তী ম্যাচে নিজেদের মাঠে নাচো ফার্নান্দেজের এক অদ্ভুতুড়ে গোলে পিএসজিকে ১-০ গোলে পরাজিত করে রিয়াল মাদ্রিদ। পরের ম্যাচে ইউক্রেনে গিয়ে শাখতার দোনেতস্কের বিপক্ষে রোনালদোর জোড়া গোল আর দানি কার্ভাহাল-লুকা মডরিচের গোলে ৭০ মিনিটে ৪-০ গোলে এগিয়ে গেলেও ম্যাচের এক পর্যায়ে ১১ মিনিটের মধ্যে ৩ গোল ফিরিয়ে দেয় শাখতার। তবে শেষ পর্যন্ত ৪-৩ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে রোনালদোর পোকার (৪ গোল), বেনজেমার হ্যাটট্রিক আর মাতেও কোভাচিচের গোলে মালমোকে ৮-০ গোলে হারায় রিয়াল মাদ্রিদ। ১১ গোল নিয়ে ইউসিএলের ইতিহাসে এক মৌসুমে গ্রুপপর্বে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড করেন রোনালদো। ৬ ম্যাচে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্বে চলে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।

★ জিদানের আগমন এবং নতুন ইতিহাসের উদ্দেশ্যে পথচলা

২০১৬ সালের শুরুতেই ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণে পদচ্যুত করা হলো বেনিতেজকে। দায়িত্বে এলেন এক সময়ের মাদ্রিদ লিজেন্ড, “লা নভেনা”র (৯ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) কারিগর জিনেদিন জিদান।

জিদান এসেই দূর করলেন দলের গুমোট আবহাওয়াটা। দলও পেল তার সুফল।

রাউন্ড অফ সিক্সটিনে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ ছিল ইতালিয়ান দল এএস রোমা। কাকতালীয়ভাবে রিয়ালের খেলোয়াড় জিদানেরও প্রথম ইউসিএলের প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ ছিল এই রোমাই। রোমে প্রথম লেগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও জেসে রদ্রিগেজের গোলে রোমার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে ইতালিয়ান মাটির অভিশাপ কাটায় রিয়াল মাদ্রিদ। এটি ছিল ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মত ইতালিতে রিয়ালের প্রথম ম্যাচ জয়। দ্বিতীয় লেগেও নিজেদের মাঠে রোনালদো আর হামেস রদ্রিগেজের গোলে একই ব্যবধানে জয় পায় রিয়াল। সেই সাথে দুই লেগ মিলিয়ে অ্যাগ্রিগেটে রোমাকে ৪-০ গোলে হারিয়ে জিদানের হাত ধরে নকআউট পর্বের ইতালিয়ান জুজু কাটায় রিয়াল মাদ্রিদ।

কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল জার্মান ক্লাব ভলভসবুর্গ। প্রথম লেগে জার্মানিতে গিয়ে ০-২ গোলে হেরে ব্যাকফুটে চলে যায় রিয়াল শিবির। ভলভসবুর্গ ডিফেন্ডার দান্তে রোনালদোকে আর ভলভসবুর্গ কোচ রিয়ালকে নিয়ে কটুক্তি করলেন। জবাবে রোনালদো শুধু বার্নাব্যুতে পার্টির ঘোষণা দিয়ে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। দ্বিতীয় লেগে ঠিকই দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে প্রায় একক দক্ষতায় রিয়ালকে অ্যাগ্রিগেটে ৩-২ গোলের জয়ে সেমিফাইনালে তুলে দিয়ে বার্নাব্যুকে এনে দিলেন উৎসবের উপলক্ষ।

সেমিফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি। ইনজুরির কারণে প্রথম লেগে দলে ছিলেন না প্রাণভোমরা রোনালদো। ইতিহাদের প্রথম লেগ তাই ছিল গোলশূন্য ড্র। রোনালদোর ফেরার ম্যাচে বার্নাব্যুতে ফার্নান্দিনহোর আত্মঘাতী গোলে দ্বিতীয় লেগে ও অ্যাগ্রিগেটে ১-০ গোলের জয়ে ফাইনালে পৌছে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।

★ উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল ২০১৬

মিলানের সান সিরোতে অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫-১৬ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল, যেখানে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। ঠিক দু বছর আগেও ২০১৪ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। ইতিহাসে এই দুটি ফাইনালই কেবল দেখেছে এই শহরের দুটি ক্লাবের ইউরোপ সেরা হবার দ্বৈরথ।

লড়াই ছিল ডাগআউটেও, যেখানে এক সময়কার নিজ নিজ ক্লাবের প্রাণভোমরা জিনেদিন জিদান ও ডিয়েগো সিমিওনে। আকর্ষণীয় এক ফাইনালের অপেক্ষাতেই ছিল ফুটবলপ্রেমীরা।

ফাইনালের ১৫ মিনিটেই এগিয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। গোলদাতা দুই বছর আগের ফাইনালের উদ্ধারকর্তা সার্জিও রামোস। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে পেপের ফাউলে পেনাল্টি পেলেও অ্যাটলেটিকোর কোয়ার্টার ও সেমিফাইনাল নায়ক গ্রিজম্যান বল বারেন ক্রসবারে। ৭৯ মিনিটে ইয়ানিক ক্যারাস্কো অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে সমতা আনেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময়ে খেলা ১-১ গোলের সমতায় অমীমাংসিত থাকায় ২০১২ সালের পর প্রথমবারের মত ইউসিএল ফাইনাল গড়ায় টাইব্রেকার নামক লটারিতে।পেনাল্টিতে রিয়ালের প্রথম ৪ শটে ভাসকুয়েজ, মার্সেলো, বেল ও রামোস লক্ষ্যভেদ করেন। অ্যাটলেটিকোর প্রথম ৪ শটে গ্রিজম্যান, গাবি ও সউল সফল হলেও হুয়ানফ্রানের শট আটকে যায় পোস্টে লেগে। পরের স্পটকিকে অব্লাককে ফাঁকি দিয়ে রোনালদোর শট জালে জড়াতেই একাদশতমবারের মত ইউরোপ জয়ের আনন্দে মেতে ওঠে রিয়াল মাদ্রিদ শিবির। একই সাথে খেলোয়াড়, সহকারী কোচ ও প্রধান কোচ হিসেবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের বিরল রেকর্ড করেন জিনেদিন জিদান।

একটি ব্যর্থ মৌসুম কাটানোর অপেক্ষায় থাকা মাদ্রিদিস্তারা মেতে উঠে “লা উনডেসিমা” জয়ের উল্লাসে।