fbpx

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগঃ রিয়াল মাদ্রিদ যেখানে সর্বশ্রেষ্ঠ

 
This Article Is brought to you by

allwhitesbd.com 

Know More

 

ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের আসর হলো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। পূর্বে এর নাম ছিল ইউরোপিয়ান কাপ। ১৯৫৫ সাল থেকে এই টুর্ণামেন্ট নিয়মিত আয়োজিত হয়ে আসছে। সবচেয়ে বেশি ১৩ বার এই টুর্ণামেন্টের শিরোপা জিতেছে রিয়াল মাদ্রিদ। একমাত্র ক্লাব হিসেবে টানা ৫ বার চ্যাম্পিয়ন হবার কীর্তিও আছে কেবল এই স্প্যানিশ দলটিরই। চলুন তাহলে একবার চোখ বুলিয়ে আসি রিয়াল মাদ্রিদের ১৩ বার ইউরোপ জয়ের ইতিহাসে।

প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ (১৯৫৬) জয়

রিয়ালের মহাদেশীয় সাফল্যযাত্রার শুরু হয়েছিল ১৯৫৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের মাধ্যমে। লা লিগায় সেবার তৃতীয় হওয়া রিয়াল দুই লেগ মিলিয়ে সুইস ক্লাব সেভেরেত্তেকে ৭-০, যুগোস্লাভিয়ার পার্টিজানকে ৪-৩ আর ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌছায়। প্যারিসের ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল স্বদেশী ক্লাব স্টাডে ডি রেইমস। ফাইনালে ফরাসি ক্লাবটির বিপক্ষে ১০ মিনিটের মধ্যেই ০-২ গোলে পিছিয়ে যায় রিয়াল। ১৪ মিনিটে ডি স্টেফানো আর ৩০ মিনিটে হেক্টর রিয়ালের গোলে সমতায় ফেরে স্প্যানিশরা। তবে ৬২ মিনিটে আবারও গোল করে এগিয়ে যায় রেইমস। নিজেদের মাঠে নিজেদের দর্শকদের সামনে রেইমসই তখন প্রথমবারের মত ইউরোপ জয়ের স্বপ্নে বিভোর। তবে ৬৮ মিনিটে মার্কুইটোসের সমতাসূচক আর ৭৯ মিনিটে হেক্টর রিয়ালের জয়সূচক গোলে রেইমসকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে রিয়ালই হাসে শেষ হাসি। পার্ক ডি প্রিন্সেস স্টেডিয়ামের ৩৮ হাজার দর্শকের সামনে প্রথমবারের মত ইউরোপসেরা হওয়া রিয়ালের উল্লাস যেন ছিল সেই দলেরই সামনের দিনগুলোতে ইউরোপ শাসন করার আগমনী বার্তা।

champions league final 1956

দ্বিতীয় ইউরোপিয়ান কাপ (১৯৫৭) জয়

পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৫৭ সালে রিয়াল জিতে নেয় তাদের ৫ম লা লিগা শিরোপা। সেই সাথে অস্ট্রিয়ান ক্লাব রেপিড উইয়েনকে ৭-৫ (অ্যাগ্রিগেটে ৫-৫ সমতায় প্লে অফে রিয়াল ২-০ গোলে জয়ী), ফ্রেঞ্চ ক্লাব নিসকে ৬-২ আর ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌছায়। সে বছর ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল রিয়ালেরই হোমগ্রাউন্ড সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে আর তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্টিনা। গোলশূন্যভাবে প্রথমার্ধ শেষ হবার পর ম্যাচের অনেকটা সময়ই গোলহীনভাবে এগিয়ে যায়।

অবশেষে ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে রিয়ালকে লিড এনে দেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। যদিও সেই গোলটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে একটু। ম্যাটিয়সকে ডি-বক্সে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় রিয়াল। ফাউলের স্বীকার হবার আগে ম্যাটিয়স ছিলেন অফসাইডে। লাইন্সম্যান অফসাইডের ইশারা দিলেও রেফারি তা প্রত্যাখান করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ৭৫ মিনিটে গেন্তো রিয়ালের দ্বিতীয় গোলটি করলে ২-০ গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে রিয়াল।

নিজেদের মাঠে ১ লাখ ২৫ হাজার দর্শকের সামনে টানা ২য় ইউরোপিয়ান কাপ আর ডাবল জয়ের উদযাপন করেন রিয়ালের খেলোয়াড়রা। সেই ফাইনাল নিয়ে সেই বছরের ব্যালন ডি অর জয়ী রেমন্ড কোপা পরে বলেছিলেন- “আমাদের দলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ১ লাখ ২৫ হাজার দর্শকের সাদা রুমাল উত্তোলন- পরিবেশটা ছিল সত্যিই অতুলনীয়। কোন স্পন্সর, টেলিভিশন কভারেজ কিছুই ছিল না সেসময়ে। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রীতি ম্যাচ খেলে ক্লাবের অর্থ যোগান দিতাম। বর্তমান সময়ের তুলনায় যা ছিল একেবারেই আলাদা”

তৃতীয় ইউরোপিয়ান কাপ (১৯৫৮) জয়

পরবর্তী মৌসুমেও রিয়াল ছিল আগের মতই ক্ষুরধার। লা লিগা জয় করে টানা দ্বিতীয়বারের মত। ইউরোপিয়ান কাপের নতুন ফরম্যাট অনুযায়ী প্রিলিমিনারি রাউন্ড থাকলেও সেখানে খেলা ব্যতিতই সরাসরি পরের পর্বে চলে যায় রিয়াল। তারপর একে একে বেলজিয়ান ক্লাব রয়্যাল অ্যান্টির্পকে ৮-১, স্বদেশী সেভিয়াকে ১০-২ আর হাঙ্গেরিয়ান ভাসাসকে ৪-২ গোলে হারিয়ে পৌছে যায় ফাইনালে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল পরবর্তীতে ৭ বারের ইউরোপ সেরার মুকুট পড়া এসি মিলান। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের হেইসেল স্টেডিয়ামের সেই ফাইনালে প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও ৫৯ মিনিটে এগিয়ে যায় মিলান। তবে ৭৪ মিনিটে রিয়ালকে সমতায় ফেরান ডি স্টেফানো। তবে ৭৭ মিনিটে দ্বিতীয়বারের মত এগিয়ে যায় ইতালিয়ান পরাশক্তিরা। তবে ফিরতি সমতায় ফিরতে সময় নেয়নি রিয়ালও, ৭৯ মিনিটেই সমতাসূচক গোল করেন হেক্টর রিয়াল। নির্ধারিত ৯০ মিনিট সময়ে ২-২ গোলে অমীমাংসিত থাকায় প্রথমবারের মত কোন ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনাল গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে ১০৭ মিনিটে রিয়ালের হয়ে জয়সূচক গোল করেন গেন্তো। এক্সট্রা টাইম শেষে এসি মিলানকে ৩-২ গোলে টানা তৃতীয়বারের মত ইউরোপ সেরা হয় রিয়াল। ফাইনাল শেষে রিয়ালের খেলোয়াড়রা কিংবদন্তি মার্কিন অভিনেতা আর পরিচালক হেনরি ওয়ারেন ব্যাটির হাত থেকে মেডেল আর ট্রফি গ্রহণ করেন।

champions league final 1958

চতুর্থ ইউরোপিয়ান কাপ (১৯৫৯) জয়

পরবর্তী মৌসুমে রিয়াল ছেড়ে যান রেমন্ড কোপা। কিন্তু একই সাথে আক্রমণভাগে যোগ হয় এক নতুন নক্ষত্র – ফেরেঙ্ক পুসকাস। রিয়ালে নতুন যোগদান করেও দলের বাকি অ্যাটাকারদের সাথে পাল্লা দিয়েই খেলছিলেন, লিগে ২৫টি গোলও করেছিলেন। তবে সেবার ইউরোপিয়ান কাপে ঠিক ছন্দে ছিলেন না গ্যালোপিং মেজর। তাই ১৯৫৯ সালের ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে রাইট উইং এ তাকে বসিয়ে পুরোনো যোদ্ধা হেক্টর রিয়ালের ওপরেই আস্থা রাখেন কোচ। লিগে সেবার তৃতীয় হওয়া রিয়াল ইউরোপিয়ান কাপে সেবারেও প্রিলিমিনারি রাউন্ড না খেলেই একে একে তুর্কি ক্লাব বেসিকতাসকে ৩-১, অস্ট্রিয়ান ক্লাব ওয়েইনারকে ৭-১ ও স্বদেশী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে ৪-৩ (অ্যাগ্রিগেটে ২-২, প্লে অফে রিয়াল ২-১ এ জয়ী) গোলে হারিয়ে ফাইনালে পা রাখে।

জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠেয় সেই ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল রিয়ালের প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ জয়ের সাক্ষী থাকা ফরাসি ক্লাব স্টাডে ডি রেইমস। ফাইনালে আসার পথে রিয়াল যেখানে মাত্র ১৪ গোল করেছিল, সেখানে রেইমস করেছিল ২৩ গোল। ফাইনালে তাই রেইমসই ছিল ফেবারিট, তারা ১৯৫৬ এর ফাইনালের প্রতিশোধও নিবে বলেই হয়ত ধারণা করেছিলেন। কিন্তু সব ধারণা ভোজবাজির মত পাল্টে গেল ফাইনালের শুরুতেই। প্রথম মিনিটেই গোল করে রিয়ালকে লিড এনে দেন এনরিকে ম্যাতেওস। ফাইনালের প্রথমেই গোল হজম করে রেইমসের আত্মবিশ্বাসে যে ধাক্কা লাগে তা থেকে আর ফিরে আসতে পারেনি তারা। উল্টো ৪৭ মিনিটে ডি স্টেফানোর গোলে রেইমসকে ২-০ গোলে হারিয়ে টানা চতুর্থবারের মত ইউরোপসেরার মুকুট পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ।

পঞ্চম ইউরোপিয়ান কাপ (১৯৬০) জয়

পরবর্তী সিজনে রিয়ালের নতুন কোচের দায়িত্ব পান অধিনায়ক হিসেবে রিয়ালের হয়ে প্রথম দুই আর খেলোয়াড় হিসেবে প্রথম তিন ইউরোপিয়ান কাপ জেতা মিগুয়েল মুনোজ। সেই সিজনে বেশ বাজে ফর্মে ছিলেন হেক্টর রিয়াল। তবে রিয়ালের আক্রমণভাগ তাতে দুর্বল হয়ে পড়েনি মোটেও। মুনোজের এক সময়ের সহযোদ্ধা ডি স্টেফানো আর গেন্তো তো ছিলেনই, আগের সিজনে দলে আসা পুসকাস আর নবাগত লুইস ডে সল আর ক্যানারিওকে নিয়ে মুনোজ গড়ে তোলেন তুখোড় এক আক্রমণভাগ। ১৯৬০ সালের ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালে পৌছানোর পথে রিয়াল একে একে লুক্সেমবার্গের জিউনেসেকে ১২-২, ফ্রেঞ্চ ক্লাব নিসকে ৬-৩ আর স্বদেশি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে ৬-২ গোলে হারিয়ে পৌছে যায় গ্লাসগোর ফাইনালে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল জার্মান ক্লাব এইনট্র্যাক্ট ফ্রাঙ্কফুর্ট।

আগেরবারে ফাইনালে বেঞ্চে থাকা পুসকাস এবার সুযোগ পান মাঠের নামার। যদিও প্রথমে পুসকাসের মাঠে থাকা নিশ্চিত ছিল না প্রথমে। শুধু পুসকাসের মাঠে নামা কেন, ফাইনালটিই অনুষ্ঠিত হওয়া আশঙ্কার মুখে পড়েছিল। রিয়ালের বিরুদ্ধে ফাইনালের প্রতিপক্ষ ফ্রাঙ্কফুর্ট ছিল পশ্চিম জার্মানির ক্লাব। আর ১৯৫৪ সালের জুলেরিমে কাপের (বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ) ফাইনালে পুসকাসের “ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স” হাঙ্গেরি ২-৩ গোলে হেরে যায় পশ্চিম জার্মানির কাছে। ফাইনালে পরাজয়ের পর পুসকাস অভিযোগ করেন পশ্চিম জার্মানির ফুটবলাররা শক্তিবর্ধক হিসেবে নিষিদ্ধ ড্রাগস নিয়েছিলেন। এরপর ডব্লিউজিএফএ (পশ্চিম জার্মানি ফুটবল এসোসিয়েশন) এমন একটি নিয়ম জারি করে যেখানে পশ্চিম জার্মানির কোন ক্লাব এমন কোন দলের মুখোমুখি হতে পারবে না যে দলে পুসকাস রয়েছে।

কিন্তু উয়েফা চায়নি ডব্লিউজিএফএ এর নিয়মের জন্যে ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনাল বাতিল হোক। একটা উপায় থাকতো পুসকাসকে ছাড়াই ফাইনালে রিয়ালের অংশগ্রহণ। তবে কি পুসকাসকে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে দর্শক হিসেবে থাকতে হবে? কিন্তু ফাইনাল খেলতে পুসকাস ছিলেন বদ্ধপরিকর। শেষমেশ পুসকাস নিজেই এগিয়ে আসলেন মধ্যস্থতা করতে। লিখিতভাবে নিজের মন্তব্যের জন্যে ক্ষমা চাইলেন পুসকাস। শেষ পর্যন্ত মাঠে নামার ব্যাপারে অনুমতি পান পুসকাস, সেই সাথে ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালও দেখে আলোর মুখ।

ফাইনালে পৌছানোর পথে গোলের বন্যা ছুটানো রিয়ালের আক্রমণভাগের গোলের ফোয়ারা বয়েছিল ফাইনালেও। হ্যাম্পডেন পার্কের সেই ফাইনালে অবশ্য ১০ মিনিটে গোল খেয়ে প্রথমে রিয়ালই পিছিয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারপরে ডি স্টেফানো আর আগের ফাইনালে অনুপস্থিত পুসকাসের হ্যাটট্রিকে ফ্রাঙ্কফুর্টকে ৭-৩ গোলে হারিয়ে টানা ৫ম ইউরোপিয়ান কাপের শিরোপা জিতে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ।

ডি স্টেফানো তবু ৩ গোল করেই হ্যাটট্রিক করে থেমেছিলেন, পুসকাস হ্যাটট্রিক তো করেছিলেনই, ৪ গোল করে পূর্ণ করেছিলেন “পোকার”ও। ইউরোপিয়ান কাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এটিই একমাত্র ফাইনাল যেখানে একই ফাইনালে একই দলের দুজন খেলোয়াড় হ্যাটট্রিক করে। পশ্চিম জার্মানির ফুটবল সংস্থার সেই নিয়ম কিংবা আগের ফাইনালে দর্শক থাকার জবাবই ছিল পুসকাসের পোকারটি। ১৯৬০ সালের ৩ জুন হ্যাম্পডেন পার্কের ১ লাখ ২৭ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ৫ম ইউরোপিয়ান কাপ জিতে যাওয়া প্রথম ক্লাব হিসেবে নিজেদের জার্সিতে উয়েফার লোগো সিল করে বসানোর সুযোগ পায়।

৬ষ্ঠ উরোপিয়ান কাপ (১৯৬৬) জয়

“ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদ” স্কোয়াডের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে?১৯২৯ সালে স্প্যানিশ লা লিগা শুরু হবার পর একমাত্র ক্লাব হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদই পেরেছে টানা ৫ মৌসুম লা লিগা জিততে এবং সেটিও দুবার, যার প্রথম কীর্তি গড়েছিল এই “ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদ”। ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বিপুল বিক্রমে টানা ৫ বার লা লিগার শিরোপা জিতে নিয়েছিল অল হোয়াইটরা। ঘরোয়া সাফল্য ধরা দিলেও এ সময়ে ইউরোপিয়ান কাপে বারবার খাবি খেতে হচ্ছিল রিয়ালকে। ১৯৬২ আর ১৯৬৪ সালে দুবার ফাইনালে পৌছালেও যথাক্রমে বেনফিকা আর ইন্টার মিলানের কাছে হেরে হয় স্বপ্নভঙ্গ। অবশেষে ১৯৬৬ সালে ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদের হাতে ধরা দিল ইউরোপিয়ান সাফল্য। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের হেইসেল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল পার্টিজান বেলগ্রেড। ফাইনালে ৫৫ মিনিটে গোল করে লিড নেয় যুগোস্লাভিয়ান ক্লাবটি। তবে অ্যামান্সিও অ্যামারো আর ফ্রান্সিস্কো সেরেনার গোলে পার্টিজানকে ২-১ গোলে হারিয়ে ৬ বছরের প্রতীক্ষার পর ৬ষ্ঠ ইউরোপিয়ান কাপ জিতে নেয়। আর এখানে ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদের ভূমিকা? ঐ যে স্প্যানিশ রাজত্ব; ৩-৫-২ ফর্মেশনে খেলা সেই ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের একাদশের প্রতিটা খেলোয়াড়ই ছিল স্পেনীয়। আর এরই মাধ্যমে প্রথম অল স্প্যানিশ (সর্ব স্পেনীয়) দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাসেন পাতায় ঠাঁই করে নেয় “ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদ”।

৭ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (১৯৯৮) জয়

এতক্ষণ ইউরোপিয়ান কাপ জয়, এখন আবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের নাম শুনে একটু খটকা লাগছে? আগে এই টুর্ণামেন্টের নাম ইউরোপিয়ান কাপ থাকলেও ১৯৯২ সাল থেকে এই টুর্ণামেন্টের নাম হয় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। টুর্ণামেন্টের নাম পাল্টে গেলেও ৩২ বছর ধরে আর এই ট্রফি ছুঁয়ে দেখা হচ্ছিল না অল হোয়াইটদের। মাঝে ১৯৮১ সালে ফাইনালে উঠলেও সেখানে লিভারপুলের কাছে ০-১ গোলে হেরে যায় রিয়াল। ১৯৯৭-৯৮ সিজনে লা লিগায় ৪র্থ হলেও ১৭ বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পৌছায় রিয়াল। ফাইনালে যাবার পথে গ্রুপপর্বে রোসেনবার্গকে ৪-১, পোর্তোকে ২-০, ৪-০ আর অলিম্পিয়াকোসকে ৫-১ গোলে হারিয়ে। তবে অলিম্পিয়াকোসের সাথে ফিরতি ম্যাচ গোলশূন্য ড্র করে আর রোসেনবার্গের কাছে ০-২ গোলে হেরেও গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে রিয়াল। নকআউট পর্বে কোয়ার্টার ফাইনালে অ্যাগ্রিগেটে বেয়ার লেভারকুসেনকে ৪-১ আর বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পদার্পণ করে রিয়াল।

champions league final 1998

আমস্টারডামের ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাস। একে তো জুভেন্টাসের টানা তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল, তার ওপর ৪ বছরে ৩টি স্কুডেট্টোও জিতে জুভেন্টাস। তার ওপর তাদের দল আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, জিনেদিন জিদান, দিদিয়ের দেশম, ফিলিপ্পো ইনজাগিদের নিয়ে বেশ হুংকার ছাড়ছে। অন্যদিকে রিয়াল সেবার ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় বেঘোরে অবস্থা তো ছিলোই, ড্রেসিংরুমের কিছু সমস্যায়ও জর্জরিত ছিল রিয়াল। ফাইনালে তাই তুরিনের বুড়িরাই ছিল নিরঙ্কুশ ফেবারিট। তবে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী সেদিন ফাইনাল শেষে সাক্ষী হয়েছিল সাদা কনফেত্তির উত্তরণের। ফাইনালে ৬৬ মিনিটে রবার্তো কার্লোসের একটি জোরালো শট ওল্ড লেডি রক্ষণে বাধা পেলে তা এসে পড়ে পেদ্রাগ মিজাটোভিচের পায়ে। তা থেকে মন্টেনেগ্রো ফরোয়ার্ড গোল করলে ঐ একমাত্র গোলেই জুভেন্টাসকে হারিয়ে ৩২ বছর পর ইউরোপ সেরার মুকুট পড়ে রিয়াল, যা ছিল তাদের ৭ম শিরোপা (লা সেপ্টিমা)

৮ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০০০) জয়

লা লিগায় সেবার রিয়ালের যাত্রা শেষ হয় ৫ম স্থান থাকার মধ্য দিয়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন ফরম্যাটে অবশ্য রিয়াল ছিল ব্যতিক্রম। নতুন ফরম্যাট অনুযায়ী দুটি গ্রুপপর্ব খেলতে হয়েছিল রিয়ালকে। প্রথম গ্রুপপর্বে অলিম্পিয়াকোসকে ৩-০, পোর্তোকে ৩-১ আর মলডেকে ৪-১ আর ১-০ গোলে হারায় রিয়াল। তবে অলিম্পিয়াকোসের সাথে ৩-৩ গোলের ড্র আর পোর্তোর কাছে ১-২ গোলের হারে ৪ জয় আর ১ ড্রয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে প্রথম গ্রুপপর্ব পার হয় রিয়াল। দ্বিতীয় গ্রুপপর্বে রিয়ালের গ্রুপসঙ্গী ছিল বায়ার্ন মিউনিখ, ডায়নামো কিয়েভ ও রোসেনবার্গ। সেখানে রোসেনবার্গকে ৩-১ আর ১-০ ও ডায়নামো কিয়েভকে ২-১ গোলে হারায় রিয়াল।

তবে কিয়েভের সাথে ২-২ গোলের ড্র আর বাভারিয়ানদের কাছে দুই ম্যাচেই পরাজয়ের কারণে গ্রুপ রানারআপ হয় রিয়াল। তবে সেখানেও ছিল ভাগ্যের ছোঁয়া। ডায়নামো কিয়েভের পয়েন্টও রিয়ালের সমান থাকলেও রিয়াল উত্তীর্ণ হয় গোল বেশি থাকার কারণে। নকআউট পর্বে কোয়ার্টার ফাইনালে আগের সিজনের চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মুখোমুখি হয় রিয়াল মাদ্রিদ। প্রথম লেগে নিজেদের মাঠে গোলশূন্যভাবে ড্র করে রিয়াল। দ্বিতীয় লেগে ওল্ড ট্রাফোর্ডে গিয়ে রেড ডেভিলদের ৩-২ গোলে হারিয়ে রিয়াল পা রাখে সেমিফাইনালে। শেষ চারে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল বায়ার্ন মিউনিখ, যাদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গ্রুপপর্বে দুটি ম্যাচেই রিয়াল পরাজিত হয়েছিল। তবে এবার চিত্রটা ভিন্ন। প্রথম লেগে ঘরের মাঠে ২-০ গোলের জয় পায় রিয়াল। দ্বিতীয় লেগে অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় ১-২ গোলে পরাজিত হলেও অ্যাগ্রিগেটে ৩-২ গোলের জয় রিয়াল চলে যায় ফাইনালে। দুই লেগেই গোল করে বিরাট ভূমিকা রাখেন ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড আনেলকা।

প্যারিসের ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল স্বদেশী ভ্যালেন্সিয়া। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এটিই প্রথম ফাইনাল যেখানে একই দেশের দুটি ক্লাব পরস্পরের মুখোমুখি। ফাইনালে আসার পথে দুই গ্রুপপর্বে রিয়ালের নকআউট রাউন্ডের দুই প্রতিপক্ষ বায়ার্ন মিউনিখ আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টপকে এসেছিল তারা। সেমিফাইনালে হারিয়েছিল বার্সেলোনাকেও। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ন্যুনতম ব্যবধানে ফাইনালে রিয়ালের বিপক্ষে ভ্যালেন্সিয়াই ছিল ফেবারিট। তবে ফেবারিট তত্ত্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ফার্নান্দো মরিয়েন্তেস স্টিভ ম্যাকমেনামান আর রাউল গঞ্জালেসের গোলে ৩-০ গোলের জয়ে ৮ম বারের মত ইউরোপ সেরার মুকুট পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ (লা অক্টাভা)

৯ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০০২) জয়

২০০১-০২ মৌসুমে লা লিগায় ৩য় হলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল ছিল সপ্রতিভ। গ্রুপপর্বে রোমা, আন্ডারলেখট আর লকোমেতিভ মস্কোর গ্রুপ থেকে ৪ জয় আর ১ ড্রয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই পরের গ্রুপপর্বে পৌছায় রিয়াল। পরের গ্রুপপর্বে রিয়াল ছিল আরো দাপুটে; প্যানাথিনাইকোস, পোর্তো আর স্পার্তা প্রাগের গ্রুপ থেকে ৫ জয় আর ১ ড্রয়ে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট রাউন্ডে পা রাখে রিয়াল। কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল বায়ার্ন মিউনিখ। অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনার প্রথম লেগে রিয়াল ১-২ গোলে হারলেও দ্বিতীয় লেগে ২-০ গোলে জেতায় অ্যাগ্রিগেটে ৩-২ গোলের অগ্রগামিতায় রিয়াল পা রাখে শেষ চারে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা। ন্যু ক্যাম্পে প্রথম লেগে রিয়াল ২-০ গোলে জেতায় রিয়াল ছিল অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থায়। দ্বিতীয় লেগে নিজের মাঠে ১-১ গোলের ড্রয়েও তাই অ্যাগ্রিগেটে ৩-১ গোলের জয়ে রিয়াল ফাইনালে পা দেয়।

zidane's-goal-2002

২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় স্কটল্যান্ডের রাজধানী গ্লাসগোর হ্যাম্পডেন পার্কে, সর্বশেষ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। কাকতালীয়ভাবে সেই ফাইনালেও ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। আর সেখানে যেমন প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল জার্মান ক্লাব ফ্রাঙ্কফুর্ট, তেমনি এখানেও প্রতিপক্ষ আরেক জার্মান ক্লাব বেয়ার লেভারকুসেন, যারা কিনা সেবার বার্সেলোনা, আর্সেনাল, জুভেন্টাস, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টপকে ফাইনালে পা রাখে। তবে ১৯৬০ এর মত শেষ দৃশ্যের পরিণতিতেও থাকলো সাদৃশ্য। ৮ মিনিটে রবার্তো কার্লোসের থ্রো-ইন থেকে পা ছুঁইয়ে রিয়ালকে লিড এনে দেন রাউল গঞ্জালেস। তবে ৫ মিনিট পরেই সমতায় ফেরে জার্মানরা। অবশেষে মাদ্রিদিস্তাদের হৃদয়ে জিদানের স্থান দখলের মুহূর্ত এলো প্রথমার্ধের শেষদিকে। সোলারির বাড়ানো লব থেকে বাঁ দিক থেকে ক্রস করলেন রবার্তো কার্লোস। ক্রসটা হয়ত ঠিকমত হয়নি। তবে জিদান জাদুর ছোঁয়া দিলেন এতেই। ১২ গজের ডি-বক্সের শেষ প্রান্ত থেকে বাম পায়ের জোরালো ভলিতে করলেন জয়সূচক গোল। গোলটি পরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ফাইনাল তো বটেই, ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোলের তালিকায় চলে গিয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে প্রধান গোলরক্ষক সিজার ইনজুরড হলে তার বদলে ৬৮ মিনিটে মাঠে নামেন ইকার ক্যাসিয়াস। পরবর্তীতে ৩টি দুর্দান্ত সেভ করে রিয়ালের জয়ে রাখেন বড় অবদান।

ucl-final-2002

১০ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৪) জয়

প্রায় এক যুগ ধরে রিয়াল মাদ্রিদ চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা তো দূরের কথা, ফাইনালেও উঠতে পারেনি রিয়াল। বরং ২০১১-২০১৩ অব্দি টানা ৩ বার সেমিফাইনালে এসে থমকে যেতে হয়েছিল তাদের। তবে ২০১৩-১ ৪ সিজনে রিয়াল ফিরে এল অন্য রূপে। গ্রুপপর্বে জুভেন্টাস , কোপেনহেগেন আর গ্যালাতাসারেইকে দুমড়ে-মুচড়ে উঠলো নকআউট পর্বে উঠলো রিয়াল। জার্মান ক্লাব শালকে ০৪ কে তাদের মাঠে ‘বিবিসি’ ত্রয়ীর প্রত্যেকের জোড়া গোলে ৬-১ গোলে হারিয়ে গড়লো ইউসিএলের নকআউট পর্বের অ্যাওয়ে ম্যাচে সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড , সাথে কাটালো জার্মানির মাটির অভিশাপ। বার্নাবুতে দ্বিতীয় লেগে ৩-১ গোলের জয়সহ দুই লেগ মিলে অ্যাগ্রিগেটে ৯-২ গোলের জয় পায় রিয়াল ।

কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা হলো বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে , যাদের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ২০১৩ সালে। প্রথম লেগে বেল, ইস্কো আর রোনালদোর গোলে বার্নাবুতে রিয়াল জিতলো ৩-০ গোলে। ডর্টমুন্ডে দ্বিতীয় লেগে রোনালদোর অনুপস্থিতিতে ২-০ গোলের পরাজিত হলেও দুই লেগ মিলে অ্যাগ্রিগেটে ৩-২ গোলের জয় নিয়ে সেমিফাইনালে পৌছে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।

সেমিফাইনালে দেখা হলো আরেক জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের সঙ্গে , যাদের কাছে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল ২০১২ সালে। প্রথম লেগে বার্নাবুতে রিয়াল জিতলো বেনজেমার একমাত্র গোলে। দ্বিতীয় লেগে অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় রিয়ালকে আগুন দেখানোর হুমকি দিলো বায়ার্ন মিউনিখ। অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনাতে আগুন জ্বললো ঠিকই। তবে সে আগুনে পুড়ে ছাই হলো বাভারিয়ানরাই। সেটা যে ছিল প্রতিশোধের আগুন । আর সেই আগুন জ্বালালো কে জানেন ? সার্জিও রামোস ! যে রামোস কিনা নয়্যারের কটাক্ষের শিকার হয়েছিল দুই বছর আগে, সেই রামোসই ৪ মিনিটের ভিতর জোড়া গোল করে বায়ার্নকে স্তব্ধ করে দেন। রামোস তো আগুন জ্বালালেন , আগুনটা তো ছড়ানো দরকার । আর আগুনটা ছড়ালেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো , রামোসের মতই জোড়া গোল করে। এই রোনালদোও দুই বছর আগে রামোসের মতই পেনাল্টি মিস করেছিলেন। নিজেদের মাঠ অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনাতেই বায়ার্ন মিউনিখ বিধ্বস্ত হলো ৪-০ গোলে।

ভয়ংকর সুন্দর ফুটবলের অনুপম প্রদর্শনী দেখিয়ে নকআউট পর্বে সব জার্মান প্রতিপক্ষকে প্রতিশোধের আগুনে পুড়িয়ে এক যুগ পর রিয়াল পৌছালো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্মস্থান পর্তুগালের লিসবনে ১২ বছর পর প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে মাঠে নামে রিয়াল মাদ্রিদ। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো ফাইনাল। ইউসিএলের ইতিহাসে এই ফাইনালই হলো যেখানে একই শহরের দুটি ক্লাব মুখোমুখি।

৩৬ মিনিটে রিয়াল গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াসের হাস্যকর ভুলে অ্যাটলেটিকোকে এগিয়ে দেন ডিয়েগো গডিন। ম্যাচের বাকি সময়টা প্রাণপণ চেষ্টা করেও গোল শোধ করতে পারছিল না রিয়াল মাদ্রি। ইনজুরি সময়ে নিজেদের রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে কার্লো বাহিনী চেষ্টা করে যাচ্ছিল ম্যাচে ফিরে আসার। মড্রিচের কর্ণার থেকে ৯৩ মিনিটে হেড থেকে গোল করে রিয়ালের “লা ডেসিমা”র স্বপ্নকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনেন সার্জিও রামোস। লিসবনের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হলো স্টেডিয়ামে উপস্থিত মাদ্রিদিস্তাদের উল্লাসে। মনে হচ্ছিল জীবন ফিরে পেয়েছে সবাই।

sergio-ramos-historic-goal
যে গোলটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম মনে রাখবে সকল মাদ্রিদিস্তারা

গোলটির মাহাত্ম্য এতটাই ছিল যে প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজও মেতে উঠেছিলেন উল্লাসে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ১-১ গোলে অমীমাংসিত থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ১১০ মিনিটে সেই ফাইনালের ম্যাচসেরা ডি মারিয়ার শট ডিফ্লেক্ট হয় অ্যাটলেটিকো গোলরক্ষক কর্তোয়ার পায়ে লেগে। আর তা থেকে হেডে গোল করে রিয়ালকে লিড এনে দেন হান্ড্রেড মিলিয়ন ম্যান গ্যারেথ বেল। ১১৮ মিনিটে দূরপাল্লার শট থেকে গোল করে ব্যবধান ৩-১ করেন বদলী খেলোয়াড় লেফটব্যাক মার্সেলো। কিন্তু মাদ্রিদের রাজপুত্রের গোল ছাড়া স্বপ্নপূরণের গল্পটা যে অপূর্ণ থেকে যায় । তাই তো ১২০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৭ গোলের রেকর্ড গড়েন রোনালদো।
অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে ৪-১ গোলে হারিয়ে এক যুগের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ” লা ডেসিমা ” জিতলো রিয়াল মাদ্রিদ।

১১তম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৬) জয়

২০১৬ সালের শুরুতেই রিয়াল মাদ্রিদের কোচের দায়িত্বে এলেন এক সময়ের মাদ্রিদ লিজেন্ড, “লা নভেনা”র (৯ম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ) কারিগর জিনেদিন জিদান।

রাউন্ড অফ সিক্সটিনে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ ছিল ইতালিয়ান দল এএস রোমা। কাকতালীয়ভাবে রিয়ালের খেলোয়াড় জিদানেরও প্রথম ইউসিএলের প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ ছিল এই রোমাই। রোমে প্রথম লেগে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও জেসে রদ্রিগেজের গোলে রোমার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে ইতালিয়ান মাটির অভিশাপ কাটায় রিয়াল মাদ্রিদ। এটি ছিল ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মত ইতালিতে রিয়ালের প্রথম ম্যাচ জয়। দ্বিতীয় লেগেও নিজেদের মাঠে রোনালদো আর হামেস রদ্রিগেজের গোলে একই ব্যবধানে জয় পায় রিয়াল। সেই সাথে দুই লেগ মিলিয়ে অ্যাগ্রিগেটে রোমাকে ৪-০ গোলে হারিয়ে জিদানের হাত ধরে নকআউট পর্বের ইতালিয়ান জুজু কাটায় রিয়াল মাদ্রিদ।

কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল জার্মান ক্লাব ভলভসবুর্গ। প্রথম লেগে জার্মানিতে গিয়ে ০-২ গোলে হেরে ব্যাকফুটে চলে যায় রিয়াল শিবির। ভলভসবুর্গ ডিফেন্ডার দান্তে রোনালদোকে আর ভলভসবুর্গ কোচ রিয়ালকে নিয়ে কটুক্তি করলেন। জবাবে রোনালদো শুধু বার্নাব্যুতে পার্টির ঘোষণা দিয়ে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। দ্বিতীয় লেগে ঠিকই দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে প্রায় একক দক্ষতায় রিয়ালকে অ্যাগ্রিগেটে ৩-২ গোলের জয়ে সেমিফাইনালে তুলে দিয়ে বার্নাব্যুকে এনে দিলেন উৎসবের উপলক্ষ।

সেমিফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি। ইনজুরির কারণে প্রথম লেগে দলে ছিলেন না প্রাণভোমরা রোনালদো। ইতিহাদের প্রথম লেগ তাই ছিল গোলশূন্য ড্র। রোনালদোর ফেরার ম্যাচে বার্নাব্যুতে ফার্নান্দিনহোর আত্মঘাতী গোলে দ্বিতীয় লেগে ও অ্যাগ্রিগেটে ১-০ গোলের জয়ে ফাইনালে পৌছে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।

মিলানের সান সিরোতে অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫-১৬ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল, যেখানে রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ নগর প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। ঠিক দু বছর আগেও ২০১৪ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল এই দুই দল। ইতিহাসে এই দুটি ফাইনালই কেবল দেখেছে এই শহরের দুটি ক্লাবের ইউরোপ সেরা হবার দ্বৈরথ।

লড়াই ছিল ডাগআউটেও, যেখানে এক সময়কার নিজ নিজ ক্লাবের প্রাণভোমরা জিনেদিন জিদান ও ডিয়েগো সিমিওনে। আকর্ষণীয় এক ফাইনালের অপেক্ষাতেই ছিল ফুটবলপ্রেমীরা।

ফাইনালের ১৫ মিনিটেই এগিয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। গোলদাতা দুই বছর আগের ফাইনালের উদ্ধারকর্তা সার্জিও রামোস। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে পেপের ফাউলে পেনাল্টি পেলেও অ্যাটলেটিকোর কোয়ার্টার ও সেমিফাইনাল নায়ক গ্রিজম্যান বল বারেন ক্রসবারে। ৭৯ মিনিটে ইয়ানিক ক্যারাস্কো অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে সমতা আনেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ও অতিরিক্ত সময়ে খেলা ১-১ গোলের সমতায় অমীমাংসিত থাকায় ২০১২ সালের পর প্রথমবারের মত ইউসিএল ফাইনাল গড়ায় টাইব্রেকার নামক লটারিতে।পেনাল্টিতে রিয়ালের প্রথম ৪ শটে ভাসকুয়েজ, মার্সেলো, বেল ও রামোস লক্ষ্যভেদ করেন। অ্যাটলেটিকোর প্রথম ৪ শটে গ্রিজম্যান, গাবি ও সউল সফল হলেও হুয়ানফ্রানের শট আটকে যায় পোস্টে লেগে। পরের স্পটকিকে অব্লাককে ফাঁকি দিয়ে রোনালদোর শট জালে জড়াতেই একাদশতমবারের মত ইউরোপ জয়ের আনন্দে মেতে ওঠে রিয়াল মাদ্রিদ শিবির। একই সাথে খেলোয়াড়, সহকারী কোচ ও প্রধান কোচ হিসেবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের বিরল রেকর্ড করেন জিনেদিন জিদান। একটি ব্যর্থ মৌসুম কাটানোর অপেক্ষায় থাকা মাদ্রিদিস্তারা মেতে উঠে “লা উনডেসিমা” জয়ের উল্লাসে।

১২তম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৭) জয়

সেবার গ্রুপপর্বে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, রোনালদোর শৈশব-কৈশারের বেড়ে ওঠার সাক্ষী স্পোর্টিং লিসবন আর নবাগত পোলিশ ক্লাব লেগিয়া ওয়ার্সো। সেই গ্রুপ থেকে রানারআপ হয়ে নকআউট রাউন্ডে পা রাখে রিয়াল। রাউন্ড অফ সিক্সটিনে দুই লেগেই ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিকে ৩-১ গোলে ও এগ্রিগেটে ৬-২ গোলের জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। সেখানে অল হোয়াইটদের প্রতিপক্ষ ছিল বায়ার্ন মিউনিখ। পিছিয়ে পড়েও এলিয়াঞ্জ এরেনায় ২-১ গোলের জয় পায়। ফিরতি লেগে নির্ধারিত সময়ে ২-১ গোলের লিড নিয়ে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় বাভারিয়ানরা।

তবে অতিরিক্ত সময় শেষে -২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে রিয়াল। প্রথম লেগে ব্রেস আর ফিরতি লেগে হ্যাটট্রিক করে এগ্রিগেটে ৬-৩ গোলে আসা জয়ের নায়ক ছিলেন রোনালদোই। সেমিফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল ২০১৪ ও ২০১৬ সালের ফাইনালিস্ট অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ।সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে নগর প্রতিদ্বন্দীদের বিরুদ্ধে প্রথম লেগে

আবারও নায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত রোনালদো। ১০, ৭৩ ও ৮৬ মিনিটে গোল করে প্রথম ফুটবলার হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা দুটি নকআউট ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার কীর্তি গড়েন সিআর সেভেন। রোনালদোর হ্যাটট্রিকেই অ্যাটলেটিকোর বিপক্ষে প্রথম লেগে ৩-০ গোলের জয়ে ফাইনালে এক পা দিয়ে রাখে রিয়াল। ফিরতি লেগে ১-২ গোলে হারলেও তাই ৪-২ গোলের অগ্রগামিতায় ফাইনালে চলে যায় রিয়াল। ২০১৭ সালের ৩ জুলাই, ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফের মিলেনিয়াম স্টেডিয়াম।

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাসের মুখোমুখি হয় রিয়াল মাদ্রিদ। ম্যাচের ২০ মিনিটেই রোনালদোর গোলে এগিয়ে গেলেও ২৭ মিনিটে সমতা ফেরায় জুভেন্টাস। প্রথমার্ধ শেষ হয় ঐ ১-১ গোলেই। তবে দ্বিতীয়ার্ধে রিয়ালের সামনে কোন প্রতিরোধ তুলেই দাঁড়াতে পারেনি জুভেন্টাস। ৬১ মিনিটে ডি-বক্সের বেশ বাইরে থেকে ক্যাসেমিরোর দুরপাল্লার শট জুভেন্টাস গোলরক্ষক বুফনকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়িয়ে যায়। ৬৪ মিনিটে লুকা মডরিচের বাড়ানো বুদ্ধিদীপ্ত বলে দুর্দান্ত ফিনিশিং এ নিজের দ্বিতীয় গোল করেন রোনালদো। ৬১ থেকে ৬৪- ৩ মিনিটেন ব্যবধানে জোড়া আঘাত ওল্ড লেডিদের আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দিয়েছিল ভালোভাবেই। হয়ত তারপরেও ফিরে আসার চেষ্টা করেছিল জুভেন্টাস, তবে রিয়ালের হাই প্রেসিং ফুটবলের সামনে বৃথা গিয়েছিল তাদের সব প্রচেষ্টা। ম্যাচের শেষ মিনিটে বদলী খেলোয়াড় গত মৌসুমের সবচেয়ে বড় চমক অ্যাসেন্সিও জুভেন্টাসের কফিনে সর্বশেষ পেরেকটি ঠুকে দিলে ৪-১ গোলের ব্যবধানে জয় নিয়ে দ্বাদশবারের মত এবং প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র ক্লাব হিসেবে টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা জিতে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ।

১৩তম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ (২০১৮) জয়

সেই সিজনে রিয়ালের গ্রুপসঙ্গী ছিল টটেনহাম, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড আর এপোয়েল নিকোশিয়া। সেই গ্রুপ থেকে রানারআপ হয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে যায় রিয়াল মাদ্রিদ। শেষ ষোলোয়ে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল পিএসজি। বার্নাব্যুতে প্রথম লেগে ৩-১ আর প্যারিসে দ্বিতীয় লেগে ২-১ গোলে জিতে এগ্রিগেটে ৫-২ গোলের জয়ে শেষ আটে পা রাখে রিয়াল।

সেখানে রিয়াল মুখোমুখি হয় আগেরবারের ফাইনালিস্ট জুভেন্টাসের। তুরিনে প্রথম লেগে ৩-০ গোলে জেতার পর রিয়াল অনায়াসে সেমিফাইনালে চলে যাবে মনে হচ্ছিল। তবে পরের লেগে জুভেন্টাস স্কোরলাইন ৩-০ করে এগ্রিগেটে সমতা নিয়ে আসে। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে যাবার উপক্রম তখন পেনাল্টি পায় রিয়াল।

সেখান থেকে রোনালদো লক্ষ্যভেদ করলে রিয়াল চলে যায় শেষ চারে। সেখানে প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল বায়ার্ন মিউনিখ। দুই লেগেই বাভারিয়ানদের কাছে আউটপ্লেইড হলেও প্রথম লেগে ২-১ গোলের জয় আর ফিরতি লেগে ২-২ গোলের ড্রয়ে দুই লেগ মিলে ৪-৩ গোলে জিতে টানা ৩য়বারের মত ফাইনালে পা রাখে স্প্যানিশ জায়ান্টরা।

কিয়েভের ফাইনালে রিয়ালের মুখোমুখি হয় লিভারপুল। গোলশুন্য প্রথমার্ধের পর দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোল করে রিয়ালকে এগিয়ে দেন করিম বেনজেমা। যদিও গোলটা দ্রুতই শোধ করে দেয় অলরেডরা। তবে বদলী হিসেবে নামা গ্যারেথ বেলের জোড়া গোলে ৩-১ গোলের জয়ে এই টুর্ণামেন্টের ত্রয়োদশ শিরোপা নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রথম ও একমাত্র ক্লাব হিসেবে টানা ৩ বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি জিতে নেয় অল হোয়াইটরা।

আর এটিই ছিল রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ক্লাবের অলটাইম টপ স্কোরার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষ ম্যাচ।

cristiano's-last-match-as-a-real-madrid-player
শেষ বেলায় ক্রিস্টিয়ানো । ছবি: marca.com