fbpx

রিয়াল মাদ্রিদ গ্যালাক্টিকোসঃ ১৯৯৮-২০০২

the-galacticos-of-real-madrid

১৯৫৫ সালে ইউরোপিয়ান কাপের পদচারণ ঘটলে ১৯৫৬ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসনে রিয়াল আরোহন করেছিল টানা ৫ বার। ১৯৬৬ সালে রিয়াল মাদ্রিদ জিতে নেয় ৬ষ্ঠ ইউরোপিয়ান কাপ। কিন্তু তারপরে রিয়াল মাদ্রিদ যেন ইউরোপে রাজত্ব করা ভুলেই গেল। এর মধ্যে টুর্ণামেন্টের নাম আর ফরম্যাট বদলে ইউরোপিয়ান কাপ থেকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ হয়েছে, নতুন নতুন অনেক ক্লাব ইউরোপ সেরাও হয়েছে। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ আর ইউরোপের সেরা হতে পারেনি। এর মধ্যে সালে ১৯৮১ সালে ফাইনালে উঠে স্বপ্নভঙ্গও হয়েছে। অবশেষে রিয়াল মাদ্রিদের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পদার্পণ ঘটলো নতুন এক যুগের, যার নাম “গ্যালাক্টিকোস”।

স্কোয়াডটির নাম গ্যালাক্টিকো কেন ?

গ্যালাক্টিকো শব্দের অর্থ তারকা, বহুবচনে দাঁড়ায় তারকাপুঞ্জ অর্থাৎ গ্যালাক্টিকোস। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের সেই স্কোয়াডকে গ্যালাক্টিকোস নামে অ্যাখ্যায়িত করার কারণ কি? চলুন তবে সেই স্কোয়াডের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আসি- গোলবারে কখনো বোডো ইগনার, কখনো সিজার মিচেল তো কখনো তরুণ ইকার ক্যাসিয়াস; সেন্ট্রাল ডিফেন্সে ফার্নান্দো হিয়েরোর সাথে কখনো ম্যানুয়েল সানচিস তো কখনো ইভান হেলগুয়েরা; রাইটব্যাকে মিচেল সালগাদো আর লেফটব্যাকে রবার্তো কার্লোস। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে ফার্নান্দো রেদোন্দো কিংবা গুতি হার্নান্দেজ কিংবা ক্লদ ম্যাকলেলে; অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে কখনো জিনেদিন জিদান তো কখনো ক্লারেন্স সিডর্ফ; উইং এ ঝড় তুলতে তৈরি লুই ফিগো, স্টিভ ম্যাকমেনামান, সান্তিয়াগো সোলারিরা। আর ফরোয়ার্ডে আছে রোনালদো লিমা, রাউল গঞ্জালেস, ফার্নান্দো মরিয়েন্তেসের মত গোলশিকারীরা। স্কোয়াডটিতে যেমন রিয়ালের ঘরোয়া একাডেমীর সফল গ্র্যাজুয়েটরা রয়েছে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রতিভাবানরাও আছেন। সব মিলিয়ে যেন বিভিন্ন নক্ষত্রের সমন্বয়ে তৈরি তারকার হাট। তাহলে আপনিই বলুন – এই স্কোয়াডটার নাম নক্ষত্রপুঞ্জ তথা গ্যালাক্টিকোস হবে না তো কি হবে?

রিয়ালের সেই স্কোয়াডকে সামলিয়েছিলেন ৪ জন কোচ। তবে অধিকাংশ সময়ে দায়িত্বে ছিলেন খেলোয়াড় হিসেবে এক সময়ের রিয়াল মাতানো ভিসেন্তে দেল বস্ক। প্রথমদিকে দল সামলেছিলেন ইয়ুপ হেইঙ্কেস। মাঝে কিছুদিন ভাগাভাগি করে দায়িত্বে ছিলেন গাস হিডিঙ্ক আর জন টুসাক। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০০০ সাল পর্যন্ত ছিলেন লরেঞ্জো সাঞ্জ আর ২০০০ পরিবর্তী সময়ে ছিলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।

রিয়াল মাদ্রিদের সেই গ্যালাক্টিকো স্কোয়াডটি যে কারণে স্মরণীয়

রিয়াল মাদ্রিদের সেই স্কোয়াডটি যে কারণে প্রধানত স্মরণীয় তা হল দীর্ঘদিন ধরে মহাদেশীয় সাফল্যের খরায় থাকা রিয়াল মাদ্রিদকে ৫ বছরের মধ্যে ৩ বার ইউরোপ সেরা করে সাফল্যের বৃষ্টিতে সিক্ত করা। গোটা ইউরোপে যে রিয়ালই ইউরোপের আসল রাজা তা আবারও প্রমাণ করেছিল এই স্কোয়াড। এছাড়াও ২০০১ আর ২০০৩ সালে জেতা লা লিগাও আছে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের তালিকায়।

সাফল্যযাত্রার গল্প

ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের প্রত্যাবর্তনঃ রিয়াল মাদ্রিদের সেই স্কোয়াডের সাফল্যযাত্রার শুরু ১৯৯৮ সালে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের মধ্য দিয়ে। তবে চাইলে ১৯৯৭ সালে জেতা লা লিগাকেও চাইলে সাফল্যের অংশ হিসেবে ধরা যায়। তবে ১৯৯৭ আর ১৯৯৮ এর স্কোয়াডের পার্থক্য বেশ চোখে পড়ার মতই ছিল।

সেবার লা লিগায় ৪র্থ হলেও ১৭ বছর পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পৌছায় রিয়াল। ফাইনালে যাবার পথে গ্রুপপর্বে রোসেনবার্গকে ৪-১, পোর্তোকে ২-০, ৪-০ আর অলিম্পিয়াকোসকে ৫-১ গোলে হারিয়ে।

তবে অলিম্পিয়াকোসের সাথে ফিরতি ম্যাচ গোলশূন্য ড্র করে আর রোসেনবার্গের কাছে ০-২ গোলে হেরেও গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে পা রাখে রিয়াল। নকআউট পর্বে কোয়ার্টার ফাইনালে অ্যাগ্রিগেটে বেয়ার লেভারকুসেনকে ৪-১ আর বরুশিয়া ডর্টমুন্ডকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পদার্পণ করে রিয়াল। আমস্টারডামের ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাস।

real-madrid-galacticos

একে তো জুভেন্টাসের টানা তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল, তার ওপর ৪ বছরে ৩টি স্কুডেট্টোও জিতে জুভেন্টাস। তার ওপর তাদের দল আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, জিনেদিন জিদান, দিদিয়ের দেশম, ফিলিপ্পো ইনজাগিদের নিয়ে বেশ হুংকার ছাড়ছে। অন্যদিকে রিয়াল সেবার ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় বেঘোরে অবস্থা তো ছিলোই, ড্রেসিংরুমের কিছু সমস্যায়ও জর্জরিত ছিল রিয়াল। ফাইনালে তাই তুরিনের বুড়িরাই ছিল নিরঙ্কুশ ফেবারিট। তবে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী সেদিন ফাইনাল শেষে সাক্ষী হয়েছিল সাদা কনফেত্তির উত্তরণের। ফাইনালে ৬৬ মিনিটে রবার্তো কার্লোসের একটি জোরালো শট ওল্ড লেডি রক্ষণে বাধা পেলে তা এসে পড়ে পেদ্রাগ মিজাটোভিচের পায়ে। তা থেকে মন্টেনেগ্রো ফরোয়ার্ড গোল করলে ঐ একমাত্র গোলেই জুভেন্টাসকে হারিয়ে ৩২ বছর পর ইউরোপ সেরার মুকুট পড়ে রিয়াল, যা ছিল তাদের ৭ম শিরোপা (লা সেপ্টিমা)।

তবে রিয়ালকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এনে দিলেও মৌসুম শেষে নিজের চাকরি বাঁচাতে পারেননি ইয়ুপ হেইঙ্কেস।

পরবর্তী ১৯৯৮-৯৯ সিজনে হেইঙ্কেসের স্থলাভিষিক্ত হন গাস হিডিঙ্ক। তবে তিনি টিকেছিলেন মাত্র ৮ মাস। ডাচ কোচের প্রস্থানের পর মৌসুমের বাকি সময়টায় দায়িত্বে ছিলেন জন টুস্যাক। তবে ফেবারিট হিসেবে মৌসুম শুরু করা আগেরবারের ইউরোপ সেরা রিয়াল মাদ্রিদ লা লিগায় রানারআপ, কিংস কাপ থেকে সেমিফাইনাল আর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়ে সিজন শেষ করলো ট্রফিহীনভাবে।

বিংশ শতাব্দীর সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়

১৯৯৯-০০ সিজনের প্রথম জন টুস্যাককেও আগের মৌসুমের গাস হিডিঙ্কের মত পরিণতি বরণ করতে হয়, আগমন ঘটে ভিসেন্তে দেল বস্কের আর এরপরেই রিয়ালে শুরু হয় দেল বস্ক যুগের। এই সিজনে দলে আসেন ম্যাকমেনামান, হেলগুয়েরা, নিকোলাস আনেলকা, মিচেল সালগাদোর মত তারকারা।

তবে লা লিগায় রিয়ালের যাত্রা শেষ ৫ম স্থান থাকার মধ্য দিয়ে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নতুন ফরম্যাটে অবশ্য রিয়াল ছিল ব্যতিক্রম। নতুন ফরম্যাট অনুযায়ী দুটি গ্রুপপর্ব খেলতে হয়েছিল রিয়ালকে। প্রথম গ্রুপপর্বে অলিম্পিয়াকোসকে ৩-০, পোর্তোকে ৩-১ আর মলডেকে ৪-১ আর ১-০ গোলে হারায় রিয়াল। তবে অলিম্পিয়াকোসের সাথে ৩-৩ গোলের ড্র আর পোর্তোর কাছে ১-২ গোলের হারে ৪ জয় আর ১ ড্রয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে প্রথম গ্রুপপর্ব পার হয় রিয়াল। দ্বিতীয় গ্রুপপর্বে রিয়ালের গ্রুপসঙ্গী ছিল বায়ার্ন মিউনিখ, ডায়নামো কিয়েভ ও রোসেনবার্গ।

সেখানে রোসেনবার্গকে ৩-১ আর ১-০ ও ডায়নামো কিয়েভকে ২-১ গোলে হারায় রিয়াল। তবে কিয়েভের সাথে ২-২ গোলের ড্র আর বাভারিয়ানদের কাছে দুই ম্যাচেই পরাজয়ের কারণে গ্রুপ রানারআপ হয় রিয়াল। তবে সেখানেও ছিল ভাগ্যের ছোঁয়া। ডায়নামো কিয়েভের পয়েন্টও রিয়ালের সমান থাকলেও রিয়াল উত্তীর্ণ হয় গোল বেশি থাকার কারণে।

নকআউট পর্বে কোয়ার্টার ফাইনালে আগের সিজনের চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মুখোমুখি হয় রিয়াল মাদ্রিদ। প্রথম লেগে নিজেদের মাঠে গোলশূন্যভাবে ড্র করে রিয়াল। দ্বিতীয় লেগে ওল্ড ট্রাফোর্ডে গিয়ে রেড ডেভিলদের ৩-২ গোলে হারিয়ে রিয়াল পা রাখে সেমিফাইনালে। শেষ চারে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল বায়ার্ন মিউনিখ, যাদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় গ্রুপপর্বে দুটি ম্যাচেই রিয়াল পরাজিত হয়েছিল। তবে এবার চিত্রটা ভিন্ন। প্রথম লেগে ঘরের মাঠে ২-০ গোলের জয় পায় রিয়াল।

দ্বিতীয় লেগে অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় ১-২ গোলে পরাজিত হলেও অ্যাগ্রিগেটে ৩-২ গোলের জয় রিয়াল চলে যায় ফাইনালে। দুই লেগেই গোল করে বিরাট ভূমিকা রাখেন ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড আনেলকা।

প্যারিসের ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল স্বদেশী ভ্যালেন্সিয়া। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এটিই প্রথম ফাইনাল যেখানে একই দেশের দুটি ক্লাব পরস্পরের মুখোমুখি। ফাইনালে আসার পথে দুই গ্রুপপর্বে রিয়ালের নকআউট রাউন্ডের দুই প্রতিপক্ষ বায়ার্ন মিউনিখ আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টপকে এসেছিল তারা। সেমিফাইনালে হারিয়েছিল বার্সেলোনাকেও। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ন্যুনতম ব্যবধানে ফাইনালে রিয়ালের বিপক্ষে ভ্যালেন্সিয়াই ছিল ফেবারিট। তবে ফেবারিট তত্ত্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ফার্নান্দো মরিয়েন্তেস স্টিভ ম্যাকমেনামান আর রাউল গঞ্জালেসের গোলে ৩-০ গোলের জয়ে ৮ম বারের মত ইউরোপ সেরার মুকুট পড়ে রিয়াল মাদ্রিদ (লা অক্টাভা)

real-madrid-8th-champions-league-trophy
অষ্টমবারের মতো উয়েফা চ্যাম্পিনস লিগ ট্রফি জয়

রিয়াল মাদ্রিদে ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের আগমন

২০০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয় রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, যাতে প্রার্থী ছিলেন আগের নির্বাচনেনই দুই প্রতিপক্ষ বর্তমান প্রেসিডেন্ট লরেন্জো সাঞ্জ আর ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।

সবার ধারণা ছিল ১৯৯৮ আর ২০০০ সালে সদ্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার কারণে সাঞ্জই আগেরবারের মতই পুনর্নিবর্বাচিত হতে যাচ্ছেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে নির্বাচন জিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে গেলেন পেরেজ।

গ্যালাক্টিকো পলিসি ও ফিগোর অভ্যুত্থান

২০০০ সালে পেরেজের নির্বাচনে জেতার পেছনে বড় অবদান ছিল গ্যালাক্টিকো পলিসির, যে পলিসির নাম ছিল “জিদান ও প্যাভন”।

প্রতি বছরেই বিশ্বের একেকজন বড় তারকাকে মাদ্রিদে আনার ঘোষণা দেন পেরেজ। নির্বাচনের পূর্বে পেরেজ বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলে তিনি বার্সেলোনার অধিনায়ক লুই ফিগোকে রিয়ালে নিয়ে আসবেন, অন্যথায় সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর ৮০ হাজার দর্শকদের পুরো সিজনে ফ্রি খেলা দেখার ব্যবস্থা করবেন। এমন পাগুলে ঘোষণায় হতবাক হয়ে গিয়েছিল সবাই। তবে নিজের কথা রেখেছিলেন পেরেজ, ৩০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ফিগোকে এনেছিলেন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায়। এছাড়াও দলে যোগ দিয়েছিলেন হোল্ডিং মিডফিল্ডে নিজের নামের রোল উদ্ভাবন করা ক্লদ ম্যাকলেলে।

perez-figo
অসম্ভবকে সম্ভব করে নিজের প্রতিশ্রুতি পালন করেছিলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ

লা লিগা ২০০০-০১ জয়

২০০০-০১ মৌসুমে ৩৮ ম্যাচে ২৪ জয় আর ৮ ড্রয়ে ৮০ পয়েন্ট নিয়ে ২৮তম লা লিগা জিতে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে যা পেরেজের প্রথম ট্রফি। সেই সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ লিগে ৮১টি গোল করে ও ৪০ গোল হজম করে। ২৪ গোল করে লা লিগায় ঐ মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন রাউল গঞ্জালেস।

জিদানের আগমন ও “লা নভেনা” জয়

প্রেসিডেন্ট পেরেজের গ্যালাক্টিকো পলিসির পরের প্রজেক্ট ছিলেন জিনেদিন জিদান। ২০০১ সালে সামার ট্রান্সফার উইন্ডোতে ৭৫ মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড ট্রান্সফার ফি এর বিনিময়ে রিয়ালে আসেন ফরাসি মহানায়ক। নিজের আগমনের সাথে সাথেই মাদ্রিদিস্তাদের মন জয় করে হয়ে উঠেন তাদের প্রাণের “জিজু”। কিভাবে? বলছি সেটি।

২০০১-০২ মৌসুমে লা লিগায় ৩য় হলেও চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল ছিল সপ্রতিভ। গ্রুপপর্বে রোমা, আন্ডারলেখট আর লকোমেতিভ মস্কোর গ্রুপ থেকে ৪ জয় আর ১ ড্রয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই পরের গ্রুপপর্বে পৌছায় রিয়াল। পরের গ্রুপপর্বে রিয়াল ছিল আরো দাপুটে; প্যানাথিনাইকোস, পোর্তো আর স্পার্তা প্রাগের গ্রুপ থেকে ৫ জয় আর ১ ড্রয়ে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট রাউন্ডে পা রাখে রিয়াল। কোয়ার্টার ফাইনালে রিয়ালের প্রতিপক্ষ ছিল বায়ার্ন মিউনিখ। অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনার প্রথম লেগে রিয়াল ১-২ গোলে হারলেও দ্বিতীয় লেগে ২-০ গোলে জেতায় অ্যাগ্রিগেটে ৩-২ গোলের অগ্রগামিতায় রিয়াল পা রাখে শেষ চারে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা। ন্যু ক্যাম্পে প্রথম লেগে রিয়াল ২-০ গোলে জেতায় রিয়াল ছিল অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থায়। দ্বিতীয় লেগে নিজের মাঠে ১-১ গোলের ড্রয়েও তাই অ্যাগ্রিগেটে ৩-১ গোলের জয়ে রিয়াল ফাইনালে পা দেয়।

২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় স্কটল্যান্ডের রাজধানী গ্লাসগোর হ্যাম্পডেন পার্কে, সর্বশেষ ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। কাকতালীয়ভাবে সেই ফাইনালেও ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। আর সেখানে যেমন প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিল জার্মান ক্লাব ফ্রাঙ্কফুর্ট, তেমনি এখানেও প্রতিপক্ষ আরেক জার্মান ক্লাব বেয়ার লেভারকুসেন, যারা কিনা সেবার বার্সেলোনা, আর্সেনাল, জুভেন্টাস, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে টপকে ফাইনালে পা রাখে।

তবে ১৯৬০ এর মত শেষ দৃশ্যের পরিণতিতেও থাকলো সাদৃশ্য। ৮ মিনিটে রবার্তো কার্লোসের থ্রো-ইন থেকে পা ছুঁইয়ে রিয়ালকে লিড এনে দেন রাউল গঞ্জালেস। তবে ৫ মিনিট পরেই সমতায় ফেরে জার্মানরা। অবশেষে মাদ্রিদিস্তাদের হৃদয়ে জিদানের স্থান দখলের মুহূর্ত এলো প্রথমার্ধের শেষদিকে। সোলারির বাড়ানো লব থেকে বাঁ দিক থেকে ক্রস করলেন রবার্তো কার্লোস। ক্রসটা হয়ত ঠিকমত হয়নি। তবে জিদান জাদুর ছোঁয়া দিলেন এতেই। ১২ গজের ডি-বক্সের শেষ প্রান্ত থেকে বাম পায়ের জোরালো ভলিতে করলেন জয়সূচক গোল। গোলটি পরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ফাইনাল তো বটেই, ফুটবল ইতিহাসের সেরা গোলের তালিকায় চলে গিয়েছে। দ্বিতীয়ার্ধে প্রধান গোলরক্ষক সিজার ইনজুরড হলে তার বদলে ৬৮ মিনিটে মাঠে নামেন ইকার ক্যাসিয়াস। পরবর্তীতে ৩টি দুর্দান্ত সেভ করে রিয়ালের জয়ে রাখেন বড় অবদান।

বিশ্বসেরা রোনালদোর আগমন ও ২০০২-০৩ লা লিগা জয়

২০০২ সালে জাপান-কোরিয়ায় অনুষ্ঠেয় ফিফা বিশ্বকাপে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেন ব্রাজিলের রোনালদো লিমা। বিশ্বকাপের পর ট্রান্সফার উইন্ডোর ডেডলাইন ডেতে ফেনোমেননকে দলে ভেড়ায় রিয়াল। ইনজুরির কারণে অবশ্য প্রথম কিছুদিন মাঠের বাইরে ছিলেন রোনালদো। তবে মাঠে ফিরেই ছুটিয়েছেন গোলের ফোয়ারা। ২৩ গোল করে ছিলেন লা লিগায় রিয়ালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। রিয়ালও ২২ জয় আর ১২ ড্রয়ে ৭৮ পয়েন্ট নিয়ে ২৯তম লা লিগা জিতে। সিজন শেষ রোনালদোর গোলসংখ্যা ছিল ৩০।

গ্যালাক্টিকো যুগের পতন

যার শুরু থাকে তার শেষও অবিশ্বস্যম্ভাবী। গ্যালাক্টিকো যুগের পতনও হয়েছিল এবং সেটা হতাশাজনকভাবেই। ২০০২-০৩ সিজনে লা লিগা জেতার পরেও দেল বস্কের সাথে চুক্তি নবায়ন করেনি রিয়াল। গ্যালাক্টিকো পলিসির সর্বশেষ প্রজেক্ট ডেভিড বেকহামের মাদ্রিদে আগমনের পরে মাদ্রিদ ত্যাগ করেন ম্যাকলেলে, সাথে চলে যান দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য সেনানী হিয়েরো। এরপরেই আস্তে আস্তে শেষ হতে থাকে রিয়ালের গ্যালাক্টিকো যুগ, যার পরিণতি হিসেবে পরবর্তী ৩ সিজনে কোন ট্রফি জিততে পারেনি রিয়াল।

রিয়াল মাদ্রিদের সেরা নক্ষত্ররা

জিনেদিন জিদান

সাবেক রিয়াল কোচ জর্জ ভালদানোর মতে “জিদান হল আর্জেন্টাইন চতুরতা আর ব্রাজিলিয়ান টেকনিকের মিলিত সমন্বয়”। রিয়াল মাদ্রিদে যতদিন খেলেছেন পায়ের জাদুতে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছিলেন সবাইকে। ২০০২ সালে “লা নভেনা” এনে দেয়া জিদানের সেই ভলি এখনো ভাসে ফুটবলপ্রেমীদের চোখে।

রাউল গঞ্জালেস

রিয়াল মাদ্রিদ লিজেন্ড এমিলিও বুত্রাগুয়েনোর মতে “রাউলই মাদ্রিদ, মাদ্রিদই রাউল”। গ্যালাক্টিকো যুগের আগে বা পরে সবসময়ই ছিলেন রিয়ালের অন্যতম মধ্যমণি হয়ে। দলের প্রয়োজনে বারবার নিজের পজিশন আর খেলার ধরণ বদলেছেন। তবে বদলাননি নিজে, সাদা জার্সিতে করেছিলেন ৩২৩ গোল। ২০১০ সালে রিয়াল ত্যাগের পর ২০১৫ সালে ক্রিশ্চিয়ানোর আগ পর্যন্ত রাউলই ছিলেন ক্লাবের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

রোনালদো লুইজ নাজারিও ডি লিমা

ফেনোমেনোনকে জিনেদিন জিদান ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে “আমি যাদের সাথে খেলেছি তাদের মধ্যে যে খেলোয়াড় আমাকে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে”। কি গতি, কি ফিনিশিং – সবদিক থেকেই ছিলেন তার সময়ে অনন্য। রোনালদোই গ্যালাক্টিকো যুগের সর্বশেষ সাইনিং যে কিনা সফল।

পরিশিষ্ট

রিয়াল মাদ্রিদের এই গ্যালাক্টিকো যুগ যেমন রিয়ালের দ্বিতীয় স্বর্ণযুগ তেমনি অনেক হাহাকারেরও জন্মদাতা। তবে দিনশেষে সাফল্য আর চোখের তৃপ্তিই শেষ কথা। গ্যালাক্টিকোসের অন্যতম তারকা ফিগোর মতে “আমরা যেন ছিলাম বিটলসের মত”। ফিগোর এক সময়কার বার্সা সতীর্থ জাভিও স্বীকার করেছেন “তাদের (রিয়াণ মাদ্রিদ) একটি বিশেষ ধারণা ছিল। তারা ছিল সত্যিই অনন্য। তারা খেলার প্রতিটি অংশে রাজত্ব করতো। আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে তারা সেরা ছিল”।